ফুলের সুবাসে কোটি টাকার বাণিজ্য

আবু তাহের খোকন

ফুল মানেই সৌন্দর্য, ভালোবাসা, পবিত্রতা ও শ্রদ্ধা। মানুষের আবেগের সঙ্গে মিশে থাকা এ ফুল এখন শুধু সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, হয়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় কৃষি ও বাণিজ্যিক পণ্য। রাজধানীর শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ের পাইকারি বাজারে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হচ্ছে। বিশেষ দিবস ও উৎসবকে ঘিরে বেচাকেনা পৌঁছে যায় কোটি টাকায়। কিন্তু সম্ভাবনাময় এ খাতের বিপরীতে রয়েছে অব্যবস্থাপনা, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থার অভাব এবং রাজধানীতে স্থায়ী পাইকারি বাজার না থাকার মতো বড় সংকট।

ভোর হওয়ার আগেই জমে ওঠে রাজধানীর ফুলের বাজার। রাত ৩টার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফুলভর্তি ট্রাক এসে হাজির হয় শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ে। গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, জারবেরা, গ্লাডিওলাসসহ নানা জাতের ফুলে মুহূর্তেই বদলে যায় বাজারের চেহারা। বাঁশের খুঁটিতে ঝুলছে রজনীগন্ধার মালা, সারি করে সাজানো গাঁদা আর স্তূপ করে রাখা গোলাপ। চারদিকে ফুলের সুবাস, ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততা আর দরদামে মুখর পুরো এলাকা। সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে পাইকারি বেচাকেনা। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রতিটি বাজারে প্রায় ১ হাজার ২০০ ব্যবসায়ী ফুল বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ ধরনের ফুল আসে এসব বাজারে। দেশের বিভিন্ন জেলার চাষি ও ব্যবসায়ীরা ফুল পাঠান। কেউ নিজস্ব বাগানের ফুল নিয়ে আসেন, আবার কেউ স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করে ঢাকার পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে ফুল নিয়ে কমিশন রেখে বিক্রির টাকা পরে তাঁদের কাছে পাঠিয়ে দেন।

ফুলের সবচেয়ে বড় জোগান আসে যশোর, ঝিনাইদহ ও সাভার থেকে। এ ছাড়া মেহেরপুর, কালীগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, রংপুর, নাটোর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ফুল আসে। ভারত থেকেও কিছু ফুল আমদানি হয়। ফুল ব্যবসার বড় মৌসুম হচ্ছে পয়লা ফাল্গুন, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস। এসব দিবসে ফুলের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফুল ব্যবসায়ীদের কাছে তাই দিনগুলো একেকটি বড় উৎসব। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিশেষ মৌসুমে প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়।

ঢাকা ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি শ্রী বাবুল প্রসাদ বলেন, ‘ফুল একটি পরিবেশবান্ধব ও সম্ভাবনাময় ব্যবসা। এটি কৃষকবান্ধবও। অল্প জমিতে অধিক লাভের পাশাপাশি শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ফুল ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারণ করতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। চাষিদের উন্নত প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাজার ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উন্নত জাত উদ্ভাবন ও ফুলের মানোন্নয়নে গবেষণা বাড়ানো জরুরি। ব্যবসায়ীদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফুল শুধু ভালোবাসা, সৌন্দর্য ও শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে থাকবে না; এটি দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম লাভজনক খাত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এখনো আধুনিক বাজারব্যবস্থা ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে সেই সম্ভাবনার বড় একটি অংশ প্রতিদিন ঝরে যাচ্ছে ফুলের মতোই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights