বগুড়ায় হিমাগারে রাখা আলু এখন কৃষক-ব্যবসায়ীদের গলার কাঁটা

আবদুর রহমান টুলু ও মামুনুর রশিদ, বগুড়া

হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে আবারও বিপাকে পড়েছেন বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর খরচ পড়ছে প্রায় ২৫ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে সেই আলু
বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে। এতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের।

বগুড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি ২০২৬ সালে জেলার ৫১টি হিমাগারে প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৮৪২ মেট্রিক টন খাবার ও বীজ আলু সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন খাবার আলু হিমাগার থেকে খালাস করা হয়েছে। বর্তমানে জেলার ৫১টি হিমাগারে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন খাবার ও বীজ আলু মজুদ রয়েছে।

এদিকে হিমাগার থেকে আলু পুরোপুরি খালাস না হলেও শঙ্কার মধ্য দিয়ে নতুন আলু চাষে প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্থানীয় কৃষক।

বগুড়া জেলা আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, গত বছরের মত এবারও আলুর বাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। লাভের আশায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করলেও বাজারমূল্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা নিজেদের সম্পদ বিক্রি করে আলু মজুত করেছিলেন। বর্তমান বাজারদরে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার ধোন্দাকোলা গ্রামের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর আট বিঘা জমিতে আলু চাষ করে ৩০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম কিছু আলু বিক্রি করে সার-বীজ কিনে এবার আবার আলু চাষ করব। কিন্তু এখন আলুর দাম এত কম যে, বিক্রি করে খরচই উঠছে না। এবার আর আলু চাষ না করে অন্য ফসল করার কথা ভাবছে তিনি।

শেরপুর উপজেলার হাপুনিয়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, জমি থেকে আলু উত্তোলন পর থেকেই আলুর দাম। আলু বিক্রি করে পরিবহণ খরচ, বস্তা, হিমাগার ভাড়া দিতেই শেষ। গত দুই বছর ধরে আলু চাষ করে আমরা ঋণগ্রস্ত।

কৃষকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও লোকসানে পড়েছেন। বগুড়ার শাজহানপুর টিএমএসএস হিমাগারের আলু ব্যবসায়ী সুলতান আহমদ এ বছর ৮০০ বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন। সব মিলিয়ে বস্তাপ্রতি তার খরচ হয়েছে ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকা দরে। এতে বস্তাপ্রতি প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত পড়ে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে হিমাগার মালিকদের মধ্যেও।

বগুড়ার মহাস্থান আগমনি কোল্ড স্টোরের ম্যানেজার আব্দুল্লাহ বলেন, এ বছর এখন পর্যন্ত হিমাগার থেকে অর্ধেক আলুও বের হয়নি। আমাদের হিমাগারে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিকটন আলু সংরক্ষণ করা হয়। এরমধ্যে ৪ হাজার ৪১৯ মেট্রিকটন খাবার আলু বের হয়েছে। বীজ আলুসহ এখনও ৭ হাজার ৫৮১মেট্রিক টন আলু মজুদ রয়েছে। অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী আলু রাখার পর আর খোঁজখবরও নিচ্ছেন না। এতে আমরা শঙ্কায় আছি।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, আগামী দুই মাসেও হিমাগারে থাকা সব আলু খালাস করা সম্ভব হবে না। কারণ ডিসেম্বর থেকে বাজারে নতুন আলু উঠতে শুরু করবে। নতুন আলু বাজারে এলে পুরোনো আলুর চাহিদা ও দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বগুড়ার নয়মাইল এলাকার সততা সীডস্ধসঢ়; এর স্বত্বাধিকারী ও তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়া, পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় বর্তমানে আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ করে বিক্রি করা লোকসান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামীতে কৃষকরা আলু চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে দেশের আলু উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বগুড়া জেলা আলু চাষি ও ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি আলুতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। কৃষককে বাঁচাতে দ্রুত আলু রপ্তানির ব্যবস্থা করা এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

বগুড়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, আলুর বিষয়ে আমরা নিয়মিত সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন মহলে তথ্য দিচ্ছি। জেলা পর্যায়ের একাধিক সভাতেও বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকার অল্প সময়ের মধ্যে বিদেশে আলু রপ্তানির বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু মজুদ থাকলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষক, ব্যবসায়ীরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights