ভারী ধাতুতে বিষাক্ত গড়াইয়ের তলদেশ

শামীম আহমেদ

পদ্মার প্রধান শাখা গড়াই। দখল-দূষণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কৃষি ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি এ নদীটি আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। গড়াই নদীর পানি বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও এর তলদেশের পলিতে জমছে সহনশীল মাত্রার চেয়ে বেশি বিভিন্ন ভারী ধাতু। নদীর ২২টি স্থান থেকে পলি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে ১০ ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। এর মধ্যে ম্যাঙ্গানিজ, তামা ও নিকেলের পরিমাণ এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা নদীর তলদেশে বসবাসকারী জীবের জন্য হুমকি। ২২টি নমুনার মধ্যে ১৬টিতেই নিকেলের মাত্রা এমন সীমা ছাড়িয়েছে, যেখানে জলজ প্রাণীর টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ গত ২ জুলাই প্রকাশিত গবেষণাটিতে গড়াই নদীর ২২টি স্থান থেকে তলদেশের পলি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্রুনাইয়ের দারুসসালাম ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এতে অংশ নেন।

গবেষণায় গড়াইয়ের পলিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা, কোবাল্ট, সিসা, আর্সেনিক, সেলেনিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও পারদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ম্যাঙ্গানিজের গড় পরিমাণ সবচেয়ে বেশি-প্রতি কেজি পলিতে ৩৬৭ মিলিগ্রাম। নিকেল পাওয়া গেছে গড়ে ২১ দশমিক ৯৭ মিলিগ্রাম, তামা ১৮ দশমিক ৬৬, সিসা ৭ দশমিক ৬৫ এবং আর্সেনিক ৫ দশমিক ৪১ মিলিগ্রাম।

গবেষকদের হিসাবে, পুরো নদীর পলিতে ভারী ধাতুর সামগ্রিক দূষণ এখনো বড় মাত্রায় পৌঁছেনি। কিন্তু নদীর কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ধাতুগুলো অস্বাভাবিকভাবে জমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে এসব স্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকরা।

১০ ধরনের ধাতু : গবেষকদের ব্যবহৃত নিরাপদ মাত্রার তুলনায় ম্যাঙ্গানিজ, তামা ও নিকেলের গড় পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিকেলের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ২২টি নমুনার মধ্যে ১৬টিতে নিকেলের মাত্রা এমন একটি সীমার ওপরে পাওয়া গেছে, যা নদীর তলদেশের ছোট প্রাণী ও অন্যান্য জলজ জীবের জন্য হুমকি।

কিছু এলাকায় ধাতুর ‘হটস্পট’ : সব এলাকায় পরিস্থিতি একই নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু স্থানে নির্দিষ্ট ভারী ধাতু অন্য এলাকার তুলনায় বেশি জমেছে। সেলেনিয়ামের ক্ষেত্রে এমন স্থানীয় জমাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর সর্বোচ্চ মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৯৩ গুণ বেশি ছিল। দুটি এলাকায় আর্সেনিক ও সিসার তুলনামূলক বেশি উপস্থিতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আশপাশের ইটভাটার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে অধিকাংশ ধাতুর উৎস একক নয়; প্রাকৃতিক উৎসের পাশাপাশি মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও এর জন্য দায়ী হতে পারে। জানা গেছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সুতা ও কাপড়ের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে। শুধু পৌর এলাকায় ৭টি ডায়িং ও অর্ধশতাধিত ভ্যাট রয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই শত শত শ্রমিক সুতা ও কাপড় রঙিন করার কাজ করেন। উপজেলায় সমিতিভিত্তিক তাঁতীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯৭৭ জন। তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ সুতা তৈরি এবং রঙের কাজ করেন। রঙের কাজে ব্যবহৃত হয় অ্যাসিডসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত কেমিক্যাল। সুতা ও কাপড় রং করার পর প্রতিদিন কয়েক হাজার টন কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি গিয়ে সরাসরি পড়ছে গড়াই নদীতে। এতে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। এ ছাড়া নদীতীরবর্তী বিভিন্ন ধাতু প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, টেক্সটাইল, পৌরসভা ও হাসপাতাল-ক্লিনিকের অপরিশোধিত বর্জ্যরে শেষ গন্তব্য হচ্ছে গড়াই নদী। এ কারণে ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে নদীটি।

শিশুদের নিয়ে বাড়তি সতর্কতা : ভারী ধাতু মানুষের শরীরে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেটিও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা। শিশুদের ক্ষেত্রে আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের প্রভাবের প্রতি তুলনামূলক বেশি সংবেদনশীলতার কথা বলা হয়েছে। নিকেলের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, নদীর তলদেশে কোনো ধাতু জমতে শুরু করলে সময়ের সঙ্গে তার পরিমাণ বাড়তে পারে এবং নদীর তলদেশের জীব ও খাদ্যশৃঙ্খলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়মিত নজরদারি করা এবং দূষণ বন্ধে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

গবেষকদের মতে, যদিও গড়াই নদীর পলির সামগ্রিক দূষণের মাত্রা এখনো বুড়িগঙ্গা-তুরাগের মতো উদ্বেগজনক নয়; তবে স্থানীয় কিছু এলাকায় ধাতুর অস্বাভাবিক উপস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি ও নদী গবেষক আমিনুর রসুল বলেন, সবগুলো নদী বিপর্যয়ের মুখে। নদীর পানির ভারী ধাতু সেচসহ নানাভাবে খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে নদীগুলোকেও সুস্থ রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights