বিশ্বের সর্ববৃহৎ পেঙ্গুইনরা বিপাকে, দ্রুতই কমছে সংখ্যা
অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন কলোনিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। অ্যান্টার্কটিকার স্যাভোদোভস্কি দ্বীপে ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিখ্যাত চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমে দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। গবেষকদের মতে, এই নাটকীয় ধসের পেছনে প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট জলবায়ু সংকট। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে স্যাভোদোভস্কি দ্বীপের এই দ্রুত পেঙ্গুইন হ্রাস অ্যান্টার্কটিকার সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বসে পড়ার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভিকের বিশেষজ্ঞ ও পেঙ্গুইন বাস্তুসংস্থানবিদ অধ্যাপক নরম্যান র্যাটক্লিফ, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, বিষয়টিকে একটি প্রকাণ্ড জনসংখ্যার বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, এই দ্বীপ থেকে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন বা পাঁচ লক্ষ প্রজননক্ষম পেঙ্গুইন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর আগে ২০২০ সালে সাউথ শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের লো দ্বীপেও চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল। সে সময় বিজ্ঞানী মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে যে পৃথিবীর সবচেয়ে বুনো এই বাস্তুতন্ত্রের কোনো না কোনো সংযোগ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
‘কারেন্ট বায়োলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন এই গবেষণাটি নির্দেশ করছে যে পরিস্থিতি যে দ্রুত গতিতে খারাপ হচ্ছে, তাতে থুতনির নিচ দিয়ে গাল পর্যন্ত কালো রেখা থাকা এই বিশেষ প্রজাতির পাখিটিকে অতি দ্রুত বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে। ২০১১ সালে যখন স্যাভোদোভস্কি দ্বীপে গণনা চালানো হয়, তখন সেখানে প্রায় ছয় লক্ষ চিনস্ট্র্যাপ এবং নব্বই হাজার ম্যাকারোনি পেঙ্গুইনের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল, যা দ্বীপটিকে বিশ্বের বৃহত্তম পেঙ্গুইন কলোনির মর্যাদা দিয়েছিল। তবে ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার এই ভয়াবহ ধসের পর ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বের বৃহত্তম কলোনির এই খেতাবটি এখন রোস সাগরের কেপ অ্যাডারে চলে গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে শীতকালীন তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়নের যুগের তুলনায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের তুলনায় দ্রুততম বৃদ্ধির একটি। এমনকি গত ৬ জুন ট্রিনিটি উপদ্বীপের এস্পেরানজা ঘাঁটিতে রেকর্ড ১৫.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতকালীন তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়, যা বছরের এই সময়ের স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বিজ্ঞানীরা একে একেবারেই চরম অস্বাভাবিক একটি ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন।
চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনরা তাদের খাদ্যাভ্যাস ও পানির নির্দিষ্ট তাপমাত্রার অভ্যাসের কারণে এই আচমকা পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। ট্র্যাকিং তথ্যে দেখা গেছে, এরা খাবারের খোঁজে দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমের অপেক্ষাকৃত শীতল পানিতে যেতে পছন্দ করে, যেখানে ওদের প্রধান খাদ্য অ্যান্টার্কটিক ক্রিল পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্রের পানি উষ্ণ হতে থাকায় ক্রিল বা ছোট চিংড়িজাতীয় এই প্রাণীগুলো আরও দক্ষিণে ওয়েডেল সাগরের দিকে সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ম্যাকারোনি পেঙ্গুইনরা খাবারের ব্যাপারে অতটা বাছাইপ্রবণ না হওয়ায় তাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনদের এই যে বিপুল ক্ষতি, তার তুলনায় ম্যাকারোনিদের এই বৃদ্ধি একেবারেই নগণ্য। অধ্যাপক র্যাটক্লিফ এ বিষয়ে বলেন, ম্যাকারোনিদের এই সামান্য বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে তেমন কোনো স্বস্তি দিচ্ছে না, কারণ জলবায়ুর বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সমস্ত পেঙ্গুইনই একসময় নিজেদের বাসযোগ্য স্থান হারিয়ে ফেলবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের এই বিলুপ্তি পুরো খাদ্য শৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পুরো বাস্তুতন্ত্রকে যদি একটি বিশালাকার জেনগা খেলার সাথে তুলনা করা হয়, তবে এর প্রতিটি উপাদান সরে যাওয়ার সাথে সাথে পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তত বাড়ছে।
গবেষকরা অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলো পরীক্ষা করে দেখেছেন এবং নিশ্চিত করেছেন যে ম্যাকারোনি ও চিনস্ট্র্যাপের মধ্যে খাদ্যের কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। এছাড়া ওই এলাকা থেকে নিকটতম মানুষের বসবাস হাজার মাইল দূরে হওয়ায় কোনো মানুষের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপও সেখানে ছিল না। যদিও ২০১৬ সালে এই আগ্নেয়দ্বীপে একটি বড় অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল এবং ধারণা করা হয়েছিল এটিই হয়তো পেঙ্গুইনদের এক লহমায় ধ্বংস করে দেওয়ার ‘পেঙ্গুইন পম্পেই’ কারণ, কিন্তু তথ্যে দেখা গেছে যে পেঙ্গুইনের সংখ্যা হ্রাসের এই ঘটনাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং বছরের পর বছর ধরে ধাপে ধাপে ঘটেছে। তদুপরি, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনরা স্বভাবতই অগ্ন্যুৎপাতের ছাই ও লাভা জমার এলাকা বা ‘অ্যাসফিক্সিয়া প্লেইন’ এড়িয়ে চলেছিল। ফলে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই সুবিশাল পেঙ্গুইন সাম্রাজ্যের পতনের জন্য বিশ্বব্যাপী চলমান জলবায়ু বিপর্যয়ই মূল দায়ী।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
