ধোঁয়াশায় বিষাক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আকাশ, দোষ কার?

অনলাইন ডেস্ক

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশ বর্তমানে ভয়াবহ বিষাক্ত ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। গত এক দশকের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া তার সবচেয়ে মারাত্মক দাবানলের মৌসুম পার করছে। কালিমান্তান ও সুমাত্রা দ্বীপের আকাশ কালচে ও আম্ব্রেলা রঙ ধারণ করেছে এবং বাতাসের মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ধোঁয়াশা ইন্দোনেশিয়ার সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। আর এতে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে সিঙ্গাপুরের আকাশচুম্বী ভবনগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে এবং মালয়েশিয়ার কিছু স্কুল বাধ্য হয়ে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফসল পুড়িয়ে জমি পরিষ্কার করার দায়ে অভিযুক্ত বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি এই সংকট রোধে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষের ওপরও জনরোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে।

জলবায়ুর স্বাভাবিক ধারা বা এল নিনোর অস্বাভাবিক প্রভাবে চলতি বছর এই শুষ্ক মৌসুমের দাবানলগুলো অত্যন্ত তীব্র রূপ নিয়েছে। স্বাধীন বন পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম নুসান্দ্রা আটলাসের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় ১০ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭৭টি দাবানলের হটস্পট রেকর্ড করা হয়েছে, যা মোট ৯ লাখ হেক্টর জমি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বন ও পিটল্যান্ডে সংঘটিত এই দাবানলের একটি বড় অংশের কারণ হলো গাছপালা ও জঙ্গল পুড়িয়ে জমি পরিষ্কার করা। এটি এমন ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি, যার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার কৃষকরা নতুন ফসলের জন্য উর্বর মাটি তৈরি করে থাকেন। তবে বর্তমানে এই আগুনগুলোর বড় একটি অংশ বাণিজ্যিক কৃষিকাজের সাথে জড়িত এবং তা অনেক বড় পরিসরে পরিচালিত হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অ্যাক্টিভিস্ট এবং সরকারি তদন্ত দলগুলো বারবার অভিযোগ করেছে যে, কিছু কোম্পানি কম খরচে বিশাল এলাকা পরিষ্কার করার সহজ উপায় হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন ব্যবহার করছে। ইন্দোনেশিয়ায় পুড়িয়ে জমি পরিষ্কার করার পদ্ধতিটি অবৈধ হলেও এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিল প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে চলতি বছরের দীর্ঘস্থায়ী ধোঁয়াশা ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষকে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করতে বাধ্য করেছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এটিকে ‘পরিবেশগত সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। গত মাসে ইন্দোনেশিয়ান কর্তৃপক্ষ দাবানলের সাথে জড়িত ২৬টি কোম্পানির কার্যক্রমের লাইসেন্স স্থগিত করার ঘোষণা দেয় এবং অন্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। কর্মকর্তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, যেসব ক্ষেত্রে অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, সেসব মামলা আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে। তবে এই ধোঁয়াশা বিতর্কে কেবল ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানিগুলোই যে জড়িয়েছে তা নয়।

চলতি মাসে প্রকাশিত গ্রিনপিসের একটি প্রতিবেদনে সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থিত এমন কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়েছে, যেগুলো ইন্দোনেশিয়ার দাবানলকবলিত জমির সাথে যুক্ত। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরভিত্তিক পাম অয়েল কোম্পানি ‘ফার্স্ট রিসোর্সেস’-এর নাম রয়েছে। গ্রিনপিসের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে এই কোম্পানির পরিচালিত দুটি ইন্দোনেশিয়ান সাবসিডিয়ারির জমিতে ৩০টিরও বেশি ধোঁয়াশার উৎস পয়েন্ট রেকর্ড করা হয়েছে। তবে ‘ফার্স্ট রিসোর্সেস’ বিবিসির কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা সমস্ত রোপণ কার্যক্রমে কঠোর নীতি বজায় রাখে এবং তাদের কার্যক্রমে শক্তিশালী অগ্নিকা প্রতিরোধ, পর্যবেক্ষণ ও আগুন নেভানোর ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।

গ্রিনপিস মালয়েশিয়ার বৃক্ষরোপণ গোষ্ঠী ‘কুয়ালালামপুর কেপং’-এর নামও উল্লেখ করেছে, যার সাবসিডিয়ারি পিটি মেনতেং জায়া সাওয়িত পেদানা ইন্দোনেশিয়ায় এমন জমি পরিচালনা করছিল যেখানে ১৯টি ধোঁয়াশার উৎস পয়েন্ট পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কুয়ালালামপুর কেপং এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই দাবানলের ‘অধিকাংশই’ তাদের নির্ধারিত এলাকার বাইরে থেকে শুরু হয়েছিল এবং সেগুলোর সবকটিই নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা জমি প্রস্তুত করতে বা আমাদের কার্যক্রমের অন্য কোনো উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত স্থানে আগুন ব্যবহারের পক্ষে নই এবং তা অনুমোদনও করি না।

কর্তৃপক্ষ অপরাধী কোম্পানিগুলোকে শাস্তি দিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, তা এখনো দেখার বিষয়। ২০১৪ সালে সিঙ্গাপুর ‘ট্রান্সবাউন্ডারি হেইজ পলুশন অ্যাক্ট’ আইন পাস করে। যার মাধ্যমে সরকার ধোঁয়াশায় অবদান রাখার জন্য দোষী সাব্যস্ত দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পায়। এর পরের বছর যখন সিঙ্গাপুরে তীব্র ধোঁয়াশার দেখা দেয়, তখন এই নতুন আইনের আওতায় বিচার করার উদ্দেশ্যে জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন ব্যবহার করেছে বলে মনে করা হয় এমন বেশ কয়েকটি ইন্দোনেশিয়ান কোম্পানিকে কর্তৃপক্ষ সমন জারি করে। কিন্তু এই পদক্ষেপ জাকার্তায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, কারণ জাকার্তা জানিয়েছিল যে এই পদক্ষেপে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আর ইন্দোনেশিয়া সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানালে, সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ জানায় যে তারা সন্দেহভাজন কোম্পানিগুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে না।

এছাড়া ২০১৫ সালেও ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কাল্লা সিঙ্গাপুরবাসীদের ক্ষুব্ধ করেছিলেন যখন তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, তারা ১১ মাস ধরে ইন্দোনেশিয়া থেকে সুন্দর বাতাস উপভোগ করেছে এবং তারা কখনো আমাদের ধন্যবাদ জানায়নি… অথচ মাত্র এক মাস ধোঁয়াশার ভোগান্তি পোহাতেই তারা রেগে গেছে। গত সপ্তাহেও একই ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দেয় যখন ইন্দোনেশিয়ার সরকারি যোগাযোগ সংস্থার প্রধান শাহগান্দা নাইংগোলান এক ভিডিওতে বলেন যে, দাবানলগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং পাশ্ববর্তী সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অক্সিজেনও আমাদের বন থেকেই আসে। তিনি আরও যোগ করেন, যখন কোনো ধোাঁয়া থাকে না, তখন আমরা অক্সিজেন পাঠাই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওটি মালয়েশিয়ান ও সিঙ্গাপুরিয়ানদের মাঝে তীব্র সমালোচনা ও হাসাহাসির জন্ম দেয়।

তবে অতীতে ধোঁয়াশা সৃষ্টির জন্য ইন্দোনেশিয়া তার প্রতিবেশীদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছে। চলতি বছর ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা দাবানল মোকাবিলায় সহায়তার প্রস্তাব দেওয়ার জন্য সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আন্তর্জাতিক সহায়তার অনুরোধ জানায়নি। ইন্দোনেশিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার জন্য সুশীল সমাজের পক্ষ থেকেও প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের পন্তিয়ানাক শহরে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী ইন্দোনেশিয়ান সরকার এবং প্রাবোও সুবিয়ান্তোর বিরুদ্ধে বারবার সংঘটিত এই বিষাক্ত ধোঁয়াশার জন্য মারাত্মক অবহেলার অভিযোগ এনে একটি ক্লাস অ্যাকশন মামলা দায়ের করেছে। তারা সরকারকে ধোঁয়াশাকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা খরচের মতো পুনরুদ্ধারমূলক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের পথ সুগম করবে। গত বছর দক্ষিণ সুমাত্রাতেও একই ধরনের একটি মামলা করা হয়েছিল, তবে তা খারিজ হয়ে যায়।

এদিকে কালিমান্তান ও সুমাত্রার স্থানীয় জনপদে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বায়ু দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়ে গেছে। সেখানে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের প্রতিদিন বিষাক্ত ধোঁয়াশার মাঝেই বাধ্য হয়ে বাইরে বের হতে হয়। সুমাত্রা দ্বীপের পেকানবারু শহরের ৬৩ বছর বয়সি মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালক ইমরায়েদি গত সপ্তাহে বিবিসি ইন্দোনেশিয়াকে বলেন, আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং বর্তমানে বাতাস টেনে মাথা ব্যথা করছে। কিন্তু আমাকে তো কাজ করতেই হবে। সরকারের উচিত আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা ভাবা। অবিলম্বে এই ধোঁয়াশা সমস্যার সমাধান করার জন্য দয়া করে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিন।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights