চীনের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে রেকর্ড ৩৩ কর্মকর্তা বহিষ্কার
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে একসঙ্গে রেকর্ডসংখ্যক ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে নেওয়া এ পদক্ষেপে দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সদস্যদের রেকর্ডসংখ্যক অনুপস্থিতি ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের ওপর চলমান শুদ্ধি অভিযানের প্রভাব স্পষ্ট করেছে।
গত বৃহস্পতিবার চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন (পঞ্চম প্লেনাম) শেষ হয়। বৈঠকে ৩৩ জন কর্মকর্তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পলিটব্যুরো সদস্য মা শিংরুই, প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া, সাবেক কূটনীতিক লিউ জিয়ানচাও এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী জিন ঝুয়াংলং। শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণ ও বিকল্প সদস্য মিলিয়ে মোট ৩৭৬ জনের মধ্যে এবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ২৭৯ জন। অর্থাৎ মূল সদস্যদের ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ অনুপস্থিত ছিলেন। আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো প্লেনামে এটিই সর্বোচ্চ অনুপস্থিতির হার। অনুপস্থিতদের বড় একটি অংশ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বহিষ্কৃত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রত্যেকের অনুপস্থিতির কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
সামরিক নেতৃত্বেও বড় পরিবর্তন
শি চিন পিংয়ের শুদ্ধি অভিযান সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে দেশটির সামরিক নেতৃত্বে। চীনের সর্বোচ্চ সামরিক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সাত সদস্যের মধ্যে এখন রয়েছেন মাত্র দুজন- সি চিন পিং এবং ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং শেংমিন। ২০২২ সালে দায়িত্ব নেওয়া কমিশনের পাঁচ সদস্যই বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
সামরিক বাহিনীর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ঝাং শেংমিনকে এবারের বৈঠকে পলিটব্যুরোর সদস্য করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালের পর কোনো দলীয় কংগ্রেস ছাড়াই মাঝপথে পলিটব্যুরোতে নতুন সদস্য যুক্ত করার ঘটনা এটিই প্রথম। কমিশনের অন্য সদস্যদের অপসারণের পর ঝাং এখন সামরিক বাহিনী থেকে আসা পলিটব্যুরোর একমাত্র সদস্য।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া। একসময় তিনি সামরিক নেতৃত্বে সি চিন পিংয়ের পরই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। তাঁর অপসারণ চীনের সামরিক নেতৃত্বে চলমান পরিবর্তনের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে।
শি চিন পিংয়ের ক্ষমতা আরও সংহত করার উদ্যোগ?
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছেন সি চিন পিং। শুরুতে প্রশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে তা দল ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছে। অভিযানে কয়েক লাখ কর্মকর্তা শাস্তির মুখে পড়েছেন; বাদ পড়েননি সি চিন পিংয়ের একসময়ের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য, দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গ দল, রাষ্ট্র এবং সামরিক বাহিনীর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তাই দলীয় শৃঙ্খলা কঠোর করা এবং অনিয়ম দূর করা জরুরি। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি এই অভিযান দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করছে। এর মাধ্যমে সি চিন পিং নিজের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে আরও নিয়ন্ত্রিত ও অনুগত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চাইছেন।
লন্ডনের কিংস কলেজের লাউ চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউন মনে করেন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখন নেতৃত্বের একটি প্রজন্মগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে পুরোনো নেতৃত্বের প্রভাব বজায় রেখে নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের কতটা ক্ষমতা দেওয়া হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
২০২৭ সালের কংগ্রেস সামনে রেখে প্রস্তুতি
এবারের প্লেনামে ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ২১তম কংগ্রেস আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত এ কংগ্রেসে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব পুনর্গঠন করা হবে। সি চিন পিং সেখানে আরও পাঁচ বছরের জন্য দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাতে তাঁর চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি হতে পারে।
দলীয় বৈঠকের বিবৃতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি দলের সদস্যদের আরও ঐক্যবদ্ধ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযানের কারণে শীর্ষ পদগুলোতে যোগ্য কর্মকর্তা খুঁজে পাওয়া এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। একদিকে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও দলীয় আনুগত্য নিশ্চিত করা, অন্যদিকে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা ধরে রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন চীনা নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্য সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান।
