ইঁদুরের মস্তিষ্কে জটিল অস্ত্রোপচার করল এআই
অনলাইন ডেস্ক
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ব। প্রথমবারের মতো একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্ট এক জ্যান্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, চিকিৎসকের প্রস্তুত করে দেওয়া ছক ধরে নয়, বরং নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে জিন থেরাপি নির্বাচন, মস্তিষ্কের সঠিক স্থান নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় রোবটিক সার্জিক্যাল রিগ পরিচালনা করে এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছে এআই। শুধু তা-ই নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে নিজেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে অপারেশনের মাঝামাঝি সময়ে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেওয়ায় মানব অপারেটরের নির্দেশ অমান্য করার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটিয়েছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
অক্সফোর্ড থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষক এবং এক্সিন থেরাপিউটিকসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী গ্যাব্রিয়েল ওকানা-সানতেরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এই ঐতিহাসিক পরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেছেন। তার গবেষক দল একটি কাস্টম-বিল্ট মোটরাইজড সার্জিক্যাল রিগের সঙ্গে এআই এজেন্টকে যুক্ত করেছিল। মৃগীরোগে আক্রান্ত একটি ইঁদুরের মডেল এবং ১৯টি সম্ভাব্য জিন থেরাপির একটি তালিকা এআই-এর সামনে তুলে ধরা হয়। সেখান থেকে কোন থেরাপিটি সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা এআই নিজে পছন্দ করে। এরপর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের ঠিক কোন অংশে ওষুধ ইনজেক্ট করতে হবে তা চিহ্নিত করে এবং গাণিতিক হিসাব কষে নির্ভুল স্থান বা স্থানাঙ্ক বের করে নেয়।
অস্ত্রোপচার চলাকালীন এআই প্রযুক্তি ক্যামেরা মারফত পুরো প্রক্রিয়াটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কোথাও রক্তপাত হচ্ছে কি না কিংবা তরল ওষুধ উপচে পড়ছে কি না, তার প্রতিটি সূক্ষ্ম বিবরণ লিখে রাখে সে। রক্তপাত ছাড়া ২৫০ নানোলিটারের মধ্যে ৩৭.৫ নানোলিটার ওষুধ সফলভাবে প্রবেশ করানোর তথ্যও সে নিখুঁতভাবে রেকর্ড করে। এমনকি সেলাই করার পর মাথার ত্বক সঠিকভাবে মিলল কি না, চোখের সামনে ক্যামেরা দেখে সেটিও নিশ্চিত করে এআই।
তবে পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর নাটকীয়তা তৈরি হয় অপারেশনের শেষভাগে। অস্ত্রোপচার চলাকালীন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মধ্যে একটি শারীরিক স্থানচ্যুতির ত্রুটি দেখা দেয়। রোবটিক রিগের পৌঁছানোর সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৩০ মিলিমিটার, কিন্তু হিসাব অনুযায়ী এআই দেখছিল তাকে যেতে হবে ৩৪ মিলিমিটার দূরে। বিপদ আঁচ করতে পেরে নিরাপত্তাবিধির দোহাই দিয়ে এআই কাজ চালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। গবেষক দল যখন তাকে পুনরায় চেষ্টা করতে বলে, তখন এআই সাফ জানিয়ে দেয় যে সুই একদম আগের জায়গায় স্থির আছে এবং সে আর চেষ্টা করবে না। গবেষকরা শূন্য রেফারেন্স বা ‘ব্রেগমা জিরো’ পুনর্নির্ধারণ করে তাকে আবার নির্দেশ দিলে এআই স্পষ্টভাবে উত্তর দেয়, এতে করে মূল সমস্যার সমাধান হয়নি এবং সে তৃতীয়বারের মতো আর ঝুঁকি নেবে না।
পরবর্তীতে দেখা যায়, ম্যানুয়াল নাড়াচাড়ার কারণে রোবটের বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে কন্ট্রোলারের সমন্বয় হারিয়ে গিয়েছিল। এআই অত্যন্ত সঠিকভাবে এই ত্রুটিটি শনাক্ত করতে পেরেছিল বলেই বিপদের মুখে নিজের নিরাপত্তা প্রোটোকল লঙ্ঘন করেনি। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত গবেষকদের ম্যানুয়ালি কোড ঠিক করতে হয়েছিল।
অবশ্য এই সফলতার মানে এই নয় যে মানুষের কোনো ভূমিকা ছিল না। ইঁদুরের মাথার খুলি কাটার বা ক্র্যানিওটমি করার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রাথমিক কাজটি করেছিলেন একজন মানব সার্জন। এ ছাড়া পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি সার্জন সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখেন। অপ্রত্যাহারযোগ্য প্রতিটি পদক্ষেপে তার অনুমোদনের প্রয়োজন হতো এবং তার হাতে ছিল একটি ইমার্জেন্সি ‘কিল সুইচ’, যাতে কোনো বিপর্যয় ঘটলে মুহূর্তের মধ্যে মোটরের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়।
অস্ত্রোপচারের পর ইঁদুরটি সুস্থ হয়ে উঠেছে, তবে এআই-এর বেছে নেওয়া থেরাপিতে তার খিঁচুনি কতটা কমল, তা জানতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, পরীক্ষায় সব এআই মডেল কিন্তু এই অস্ত্রোপচারে সম্মত হয়নি। অ্যানথ্রোপিকের অপাস ৫.৫ মডেলটি জৈবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার অজুহাত দেখিয়ে শুরুতেই অপারেশনে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে, অপাস ৫ মডেলটি গ্রাফ পেপারে পানি দিয়ে ট্রায়াল দিতে রাজি হলেও আসল ইঁদুরের ওপর কাজ করতে মানা করে দেয়। তার যুক্তি ছিল, অস্ত্রোপচারের মাঝে কোনো গোলযোগ ঘটলে ইঁদুরের মস্তিষ্কে সুই থাকা অবস্থাতেই বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সোনেট ৫ নামের মডেলটি এই ঐতিহাসিক ঝুঁকি নেয় এবং সফলতা অর্জন করে।
ওকানা-সানতেরোর মতে, এআই-এর এই স্বপ্রণোদিত অস্বীকৃতি ও যুক্তিবোধ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।
সূত্র: এনডিটিভি
