উৎপাদন বাড়ে, কমে না দাম

ইমরান চৌধুরী

দেশে ডিমের উৎপাদন বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। সরকারি হিসাবে, এক যুগের ব্যবধানে ডিমের উৎপাদন প্রায় চার গুণ হয়েছে। মাথাপিছু প্রাপ্যতাও বেড়েছে। অথচ বাজারে এর প্রভাব খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। বরং খুচরা বাজারে ডিমের দাম বেড়েই চলেছে। দুই-তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। আর দুই মাসে বেড়েছে প্রায় ৩০ টাকা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- দেশে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ার পরও ডিমের দাম কেন কমছে না?

এমন পরিস্থিতিতে আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বজুড়ে ডিম দিবস পালিত হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটি যৌথভাবে পালন করছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল এবং ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখা।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদন হয়েছিল ৬০৭ কোটি ৮৫ লাখ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭১১ কোটি পিস, যা বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে হয় ২ হাজার ৩৩৮ কোটি পিস। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখে। অর্থাৎ এক যুগের ব্যবধানে চার গুণ বেড়েছে উৎপাদন। একই সময়ে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতাও বেড়ে বছরে ১৩৭ দশমিক ১৯টিতে দাঁড়িয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ২০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। অর্থাৎ সরকারি পরিসংখ্যানে ডিমের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা নিয়ে বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরও বলছে, গত এক দশকে দেশে ডিমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। লেয়ার মুরগির জাত উন্নয়ন, বাণিজ্যিক খামার সম্প্রসারণ এবং পোলট্রি খাতে বিনিয়োগের ফলে উৎপাদনে এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

উৎপাদনের এই হিসাবের সঙ্গে অবশ্য বাজারের চিত্র মিলছে না। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর-১১ কাঁচাবাজার ও মুসলিম কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাদামি ফার্মের ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। সাদা ডিমের ডজন ১৫০ টাকা। পাড়া-মহল্লার বাজারে বাদামি ডিমের হালি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ ডজনপ্রতি দাম পড়ছে ১৬৫ টাকা। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই মাস আগেও ডজনপ্রতি ডিমের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। এক মাস আগে তা বেড়ে প্রায় ১৫০ টাকা হয়। এরপর দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকে আরও ১০ টাকা বেড়ে এখন রাজধানীর খুচরা বাজারে ডজনপ্রতি দাম ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের হালি ছিল ৩৪ টাকা। আর ডজন বিক্রি হয়েছিল ১০০-১০২ টাকায়।

ক্যাব সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে ডিমের উৎপাদন বাড়লেও বাজারে এর সুফল মিলছে না। বরং উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও দাম বাড়ছে, যা বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ডিমের বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কোথাও অতিরিক্ত মজুত, কৃত্রিম সংকট বা বাজার কারসাজি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিরা যাতে ন্যায্য দাম পান, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

নাজের হোসাইন আরও বলেন, বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি বা অস্বাভাবিক মজুত থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা বাড়াতে হবে। কারণ খামারি ন্যায্য দাম না পেলে একদিকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে ভবিষ্যতে উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অবশ্য ডিমের বাজার নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মৌসুমভেদে ডিমের দাম ওঠানামা করে এবং অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক হাতবদলের কারণে দাম বাড়ে। ডিমের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। মাছ-মাংসের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দামের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ডিমকে সাধারণ মানুষের সহজলভ্য প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে সেই ডিমও অনেক পরিবারের খাদ্যতালিকায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights