ক্ষোভে ফুঁসছে জাপান, ডাকাতি ও হত্যার অভিযোগে মার্কিন সেনা গ্রেফতার
অনলাইন ডেস্ক
জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে এক নারীকে ডাকাতি ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক মার্কিন মেরিন সেনার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ওই সেনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে, এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কারণে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ, দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা আবারও প্রকাশ্যে এসেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে ৫২ বছর বয়সী ওকিনাওয়ার বাসিন্দা আই সাতো বলেন, খবরটি শোনার পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল- ‘আবারও!’
তিনি বলেন, “আমি ছোটবেলায় যা দেখেছি, এত বছর পরও তার কোনও পরিবর্তন হয়নি। একই ঘটনা আমরা আর কতবার দেখব? কত মানুষকে নতুন করে ভুক্তভোগী হতে হবে, কত পরিবারকে কষ্ট পেতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত ওকিনাওয়ার মানুষকে কতবার শোক করতে হবে?”
৬২ বছর বয়সী গিনোয়ানের বাসিন্দা আকেমি ওশিরোর অনুভূতিও একই রকম। তিনি বলেন, “এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু যেহেতু এগুলো বারবার ঘটছে, তাই এখন আর অবাকও হই না।”
হোটেলকক্ষে নারীর মরদেহ
জাপানের ওকিনাওয়া প্রিফেকচারাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর ভোরে নাহা শহরের একটি হোটেলকক্ষ থেকে ৩৯ বছর বয়সী আন্না ইয়াগি নামের এক জাপানি নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় ২০ বছর বয়সী মার্কিন মেরিন সেনা ল্যান্স করপোরাল ডেভিন জ্যাকব ব্যালার্ডকে রবিবার গ্রেফতার করে জাপানি পুলিশ। তিনি মার্কিন মেরিন কোরের তৃতীয় মেরিন এক্সপেডিশনারি ফোর্সের সদস্য এবং গিনোয়ান সিটির মেরিন কোর এয়ার স্টেশন ফুতেনমায় দায়িত্বে ছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। অভিযোগটি তার সামরিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে তাকে জাপানি হেফাজতে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম পুলিশের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে ওই নারীর সঙ্গে হোটেলে প্রবেশ করতে এবং পরে তার জিনিসপত্র নিয়ে একা বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে। ইয়াগির গলায় তারজাতীয় কোনও বস্তু দিয়ে শ্বাসরোধের চিহ্ন ছিল বলেও পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে তদন্ত চলমান থাকায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মার্কিন সেনার বিচার নিয়ে জটিলতা
জাপানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগ উঠলে তারা দায়িত্ব পালনকালে ছিলেন কি না, সেটি বিচারিক এখতিয়ার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কোনও মার্কিন সেনা সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় অপরাধ করেছেন কি না, তার ওপর নির্ভর করতে পারে কোন দেশের হাতে মামলার প্রাথমিক এখতিয়ার থাকবে। জাপানের এখতিয়ার থাকলেও কোনও সন্দেহভাজন মার্কিন হেফাজতে থাকলে, অভিযোগ গঠনের আগ পর্যন্ত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাকে মার্কিন হেফাজতে রাখা সম্ভব।
এ কারণেই ওকিনাওয়ায় মার্কিন সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া ও হেফাজত নিয়ে অতীতে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে।
টোকিওর প্রতিবাদ, তবু সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা
ঘটনার পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি ওয়াশিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তবে ওকিনাওয়ার অনেক বাসিন্দা মনে করছেন, শুধু প্রতিবাদ জানানো যথেষ্ট নয়।
আই সাতো বলেন, “দশকের পর দশক ধরে আমরা একই ধরনের সরকারি বক্তব্য শুনে আসছি- তারা প্রতিবাদ জানাবে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। এসব শুনে আমি গভীরভাবে হতাশ।”
তিনি প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার আহ্বান জানান। আই সাতোর ভাষায়, দুই নেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা যেহেতু বারবার তুলে ধরা হয়, তাই সেই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে এ ধরনের ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, সেজন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জাপানের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষোভ দেখা দেয়। নাহা ও টোকিওতে শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচার দাবি করেছেন। একজন লিখেছেন, “আর নয়।”
ওকিনাওয়ায় মার্কিন ঘাঁটি নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ
জাপানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ওকিনাওয়া। দ্বীপটিতে একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং সেখানে অবস্থান করছে হাজার হাজার মার্কিন সেনা।
বর্তমানে জাপানে প্রায় ৫৫ হাজার মার্কিন সামরিক সদস্য অবস্থান করছেন। তাদের বড় একটি অংশ ওকিনাওয়ায় মোতায়েন। জাপানের আয়তনের দিক থেকে ছোট প্রিফেকচারগুলোর একটি হলেও দেশটিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একচেটিয়া ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ জমির প্রায় ৭০ শতাংশই ওকিনাওয়ায় অবস্থিত।
এই বিপুল সামরিক উপস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভের কারণ। ধর্ষণ, হামলা ও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতো অপরাধের পাশাপাশি সামরিক বিমানের শব্দ, দুর্ঘটনা এবং বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মতো ঘটনাও স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
১৯৭২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে মার্কিন বাহিনীর দখলে যাওয়ার পর ওকিনাওয়া জাপানের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে। এরপর থেকে মার্কিন সামরিক সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ঘটনায় ওকিনাওয়া প্রিফেকচারাল সরকারের হিসাব অনুযায়ী ৬ হাজার ৪০৯টি গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে।
অতীতের ভয়াবহ ঘটনাগুলোও মনে করিয়ে দিচ্ছে নতুন ঘটনা
ওকিনাওয়ায় মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৬ সালে স্থানীয় ২০ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুরো দ্বীপে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় কয়েক হাজার নয়, বরং কয়েক দশক হাজার মানুষ মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে এক সাবেক মার্কিন মেরিন সেনাকে ওই অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এরও আগে ১৯৯৫ সালে তিন মার্কিন সেনা একটি স্টেশনারি দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে ১২ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণ, মারধর ও ধর্ষণ করে। ঘটনাটি ওকিনাওয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে জনমতকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছিল।
এছাড়া ২০২৫ সালে এক মার্কিন মেরিন সেনাকে জাপানের এক নারীকে শ্বাসরোধ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
যুদ্ধের ৮০ বছর পরও নিরাপত্তাহীন
নতুন করে হত্যার অভিযোগের ঘটনায় ওকিনাওয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিও সামনে এসেছে।
বিবিসিকে ৪৮ বছর বয়সী দুই সন্তানের মা হিতোমি মিয়াগি বলেন, “যুদ্ধ শেষ হওয়ার ৮০ বছর পরও আমরা যে ওকিনাওয়ায় বসবাস করি, সেটি এমন এক জায়গা যেখানে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি।”
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা যায়- এমন একটি ওকিনাওয়ার প্রত্যাশায় তারা তাদের প্রতিবাদ ও দাবি অব্যাহত রাখবেন।
নতুন এই হত্যার অভিযোগ তাই শুধু একটি ফৌজদারি তদন্তের বিষয় হয়ে থাকেনি; বরং জাপানের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি-কেন্দ্রিক অঞ্চল ওকিনাওয়ায় দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা
