চে গুয়েভারা: মৃত্যুও যাকে মুছে দিতে পারেনি
অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ভার্সন
মৃত্যুর প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও চে গুয়েভারা আজও অনন্য উচ্চতায় সমাসীন। বয়সের ছাপ তাকে ছুঁতে পারেনি, পাকা চুল কিংবা বলিরেখা তাকে স্পর্শ করেনি; তিনি এখনো ৩৯ বছরের সেই চিরতরুণ; পোশাকে এবং চেতনায় সব সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এক অকুতোভয় যোদ্ধা। ক্লান্তিহীন মেজাজ, মাথায় বেরেট আর অগোছালো চুলের সেই ছবি আজও বিশ্বজুড়ে তরুণ বিপ্লবীদের প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।
১৯২৮ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্মগ্রহণ করেন এরনেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। পেশায় চিকিৎসক হলেও তার গন্তব্য বদলে যায় জীবনবোধ ও বিপ্লবের টানে। ১৯৫১ সালে বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোর সাথে বিখ্যাত মোটরসাইকেল ‘লা পোদেরোসা টু’-তে চড়ে দক্ষিণ আমেরিকা পরিভ্রমণে বের হন তিনি। সেই যাত্রায় দারিদ্র্য, ব্যাধি আর শোষণের দৃশ্য তার ভেতরে যে গভীর রেখাপাত করেছিল, তার বিবরণ স্থান পায় ‘দ্য মোটরবাইক ডায়েরিজ’-এ। এই ভ্রমণই এক তরুণ চিকিৎসা শিক্ষার্থীকে রূপান্তর করে এক সমর্পিত মার্ক্সবাদীতে। পথেই তার নামের সাথে যুক্ত হয় ‘চে’ ডাকনামটি। ১৯৫৪ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে সাক্ষাতের পর ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সালের গেরিলা যুদ্ধে কাস্ত্রোর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মাঠ কমান্ডার হিসেবে ভূমিকা রাখেন চে, যা শেষ পর্যন্ত কিউবার স্বৈরাচারী শাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তার পতন ঘটায়।
১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে অর্জিত সেই বিজয়ের পর কিউবা সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান চে গুয়েভারা। তিনি জাতীয় ব্যাংকের প্রধান ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং কিউবাকে সোভিয়েত-ঘেঁষা কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখেন। তিনি ‘ফোকো’ যুদ্ধরীতির প্রধান রূপকার ছিলেন, যার মূল কথা ছিল একটি ছোট ও সুশৃঙ্খল সশস্ত্র দলই একটি বৃহৎ গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করতে পারে। তবে কিউবার তৎকালীন অর্থনীতি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং চের চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কিউবার তৎকালীন নেতৃত্বের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়। অবশেষে ১৯৬৫ সালে তিনি সরকার থেকে পদত্যাগ করে জনসম্মুখ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।
কিউবা ছেড়ে তিনি কঙ্গোতে যান প্যাট্রিস লুমুম্বার প্রতিষ্ঠিত মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন দিতে। তবে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি বলিভিয়ায় পদার্পণ করেন, সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশজুড়ে বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়ার মূল কেন্দ্র হিসেবে বলিভিয়াকে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে। ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে ছদ্মবেশে বলিভিয়ায় প্রবেশ করে ‘ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি অব বলিভিয়া’ গঠন করেন তিনি। বলিভিয়া ও ব্রাজিলের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তার করাই ছিল তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। কিন্তু পরিস্থিতি তার ভাবনামতো এগোয়নি। ১৯৬৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে বলিভিয়ায় চের গেরিলা অভিযান বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। খাদ্যাভাব, শারীরিক ক্লান্তি আর স্থানীয়দের সমর্থনের অভাবে দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আর ঠিক তখনই মার্কিন সিআইএ তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামের কাছে মার্কিন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তাকে ঘিরে ফেলে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পায়ে গুলি লাগার পর এবং হাতের রাইফেলটি অকেজো হয়ে যাওয়ার পর তিনি বন্দী হন। সেনাদল যখন তাকে ঘিরে ধরে, তখন তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, গুলি করো না! আমি চে গুয়েভারা, আমার জীবিত থাকার মূল্য তোমাদের কাছে মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি। বন্দী করার পর তাকে লা হিগুয়েরার একটি এক কক্ষের স্কুলঘরে রাতভর আটকে রাখা হয়। পরের দিন সিআইএ প্রতিনিধি ফেলিক্স রদ্রিগেজ সেখানে উপস্থিত হন। বলিভিয়ার সামরিক প্রধানরা আশঙ্কা করেছিলেন যে তাকে প্রকাশ্যে বিচারে সোপর্দ করলে তিনি একটি বিপ্লবী প্রতীকে পরিণত হবেন, তাই তারা বিচার ছাড়াই তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন এবং এটিকে যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু হিসেবে দেখানোর কৌশল গ্রহণ করেন।
ফেলিক্স রদ্রিগেজ যখন চে’কে জানান যে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতে যাচ্ছে, তখন চে তা শান্তভাবে গ্রহণ করে বলেছিলেন, এটাই ভালো। আমার কখনো জীবিত অবস্থায় ধরা পড়া উচিত হয়নি। এরপর সার্জেন্ট হেইমে তেরানকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে এটি সম্মুখযুদ্ধের ক্ষত বলে মনে হয়। ঘাতক যখন অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে, তখন চে শেষবারের মতো গর্জে উঠে বলেছিলেন, আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ। গুলি চালাও, তুমি তো কেবল একজন মানুষকেই হত্যা করতে যাচ্ছ। বাহু, পা ও বুকে একাধিক গুলি লাগার পর ৩৯ বছর বয়সে এই মহান বিপ্লবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর পর বলিভিয়ার সেনারা তার দেহ ভাল্লেগ্রান্দে নিয়ে একটি হাসপাতালের লন্ড্রি সিঙ্কে রেখে দেয়, যেখানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহকদের তা দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে তার হাত দুটি কেটে নেওয়া হয়েছিল। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসনের কাছে পাঠানো স্মারকে নিশ্চিত করা হয় যে চে গুয়েভারা আর বেঁচে নেই। সেই খবর ছড়িয়ে পড়লে হাভানায় বিপুল জনসমুদ্রে ফিদেল কাস্ত্রো দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, যারা মনে করে চের মৃত্যুর মাধ্যমে তার আদর্শ পরাজিত হয়েছে, তারা সম্পূর্ণ ভুল ভাবছে।
মৃত্যুর দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর ১৯৯৭ সালে কিউবান ও আর্জেন্টাইন বিশেষজ্ঞদের যৌথ দল ভাল্লেগ্রান্দের একটি বিমানঘাঁটির নিচে এক গণকবরে চের অস্থি মজ্জার সন্ধান পায়। সামরিক মর্যাদায় তার দেহাবশেষ হাভানায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং ফিদেল কাস্ত্রোর উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরবর্তীতে সান্তা ক্লারায় নবনির্মিত চে গুয়েভারা সমাধিসৌধে তাকে সমাহিত করা হয়। সেই সান্তা ক্লারা, যেখানে ১৯৫৮ সালে কিউবান বিপ্লবের সিদ্ধান্তমূলক জয় নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। শেষ বিদায়ের সেই মুহূর্তে কাস্ত্রো আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, আমরা চে’কে বিদায় জানাতে আসিনি, আমরা তাকে স্বাগতম জানাতে এসেছি।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
