যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি: সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের দখলে
শোবিজ ডেস্ক
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও শাসনের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব ও ক্ষুব্ধ গণরায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটাররা। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল জয়ের মাধ্যমে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস—একচ্ছত্র নিজেদের দখলে নিয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা।
গত কয়েক প্রজন্ম ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও এবার বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। মাত্র দুই বছর আগে যেসব রক্ষণশীল এলাকার ভোটাররা ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে পাঠিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে চরম হতাশা, জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয় এবং ট্রাম্পের দেশ পরিচালনার ধরন নিয়ে গভীর ক্ষোভের কারণে এবার তারা উল্টো ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে নাটকীয় রায় দিয়েছেন।
এই নির্বাচনের ফলাফল এতটাই নজিরবিহীন ছিল যে প্রায় এক শতাব্দী পর কানসাস থেকে তাদের প্রথম ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যেখানে সাউথ ক্যারোলিনায় প্রায় ১৮ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, সেখানে এবার ট্রাম্পের হাত ধরে আসা নিজস্ব সিনেট প্রার্থীকে পরাজিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। দেশের সবচেয়ে বড় রিপাবলিকান রাজ্য টেক্সাসেও ডেমোক্র্যাটরা তাদের কয়েক দশকের পরাজয়ের বৃত্ত ভেঙে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটিয়েছে; তারা সেখানে সিনেট আসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের তিন মেয়াদের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছে। এই নিরঙ্কুশ বিজয় ওয়াশিংটনে এক নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে যাচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘ দুই বছর ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর থেকে রিপাবলিকানদের একক আধিপত্যের অবসান ঘটতে চলেছে।
আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের প্রশাসন, তার পরিবার এবং ঘনিষ্ট সহযোগীদের কার্যকলাপ তদন্ত করার বিশাল ক্ষমতা পাবে। পাশাপাশি যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তাদের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে বাধ্য থাকবে সরকার। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ট্রাম্পের পছন্দের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন, এমনকি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে যদি কোনো বিচারকের পদ শূন্য হয়, তবে সেই মনোনয়নও রুখে দেওয়ার ক্ষমতা এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
বিজয়ের পর দলটির সিনেট মাইনোরিটি লিডার চাক শুমার অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানান, সিনেটের এই ভৌগোলিক মানচিত্রের পরিবর্তন আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে এবং ভোটারদের এই পরিবর্তনের দাবি তারা বাস্তবায়ন করবেন।
সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন না। গত এক দশক ধরে তিনি নিজের দলের ওপর যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন, নির্বাচনী পরাজয়ের পর এখন ওয়াশিংটনে তার সেই ক্ষমতার প্রভাব দ্রুত কমতে শুরু করতে পারে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে ট্রাম্প-উত্তর যুগে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তার দলের সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে ইতিমধ্যেই নিজস্ব রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।
তবে ২০২০ সালের মতো এবার নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের কোনো পথ ট্রাম্প বেছে নেননি। ডেমোক্র্যাটদের ভয় কাটিয়ে তিনি এই রায় মেনে নিয়েছেন এবং ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। ট্রাম্প জানান, তিনি অভিবাসনের মতো কিছু প্রধান ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে রাজি আছেন, তবে তারা যদি কোনো ক্ষতিকর আইন পাস করায় তবে সেটিতে ভেটো দেয়ার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন।
পুরো নির্বাচনজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণার মূলে ছিল সরকারি দুর্নীতি এবং দিন দিন বেড়ে চলা জীবনযাত্রার ব্যয়। ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে দেশে কীভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, তা তারা জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। একই সঙ্গে দ্বিতীয় মেয়াদের হোয়াইট হাউসে আসার পর ট্রাম্প পরিবার যে শত শত কোটি ডলার বাণিজ্য করেছে, সেই বিষয়টিও ডেমোক্র্যাটরা জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের নেতৃত্বে মূলত ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের মতো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কিত ইস্যুগুলোতে জোর দিয়েছিল এবং ডেমোক্র্যাটদের উগ্র বলে প্রচার করেছিল। কিন্তু বুথফেরত জরিপে দেখা যায় ভোটাররা কালচারাল ইস্যুর চেয়ে নিজেদের জীবনযাত্রার আর্থিক সংকট ও পকেটের হিসাব নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির এই সাফল্য দেশের এক বা দুটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পুরো দেশজুড়ে জোয়ারের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভোট গণনাকৃত দেশের প্রায় ১,৭০০টি কাউন্টির সিংহভাগেই রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে হেরেছে। ধনী কিংবা দরিদ্র পরিবার বসবাসকারী এলাকা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত বা কম শিক্ষার হার থাকা সমস্ত অঞ্চলেই ডেমোক্র্যাটরা ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে। বিশেষ করে ল্যাটিনো জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছিল চোখে পড়ার মতো, যার মধ্যে রয়েছে টেক্সাসের সীমান্ত এলাকা এবং কানসাসের কৃষিভিত্তিক ছোট শহরগুলো, যে এলাকাগুলোতে ২০২৪ সালেও ট্রাম্পের বেশ শক্ত প্রভাব ছিল। কানসাসের সিওয়ার্ড কাউন্টিতে, যেখানে দেশের অন্যতম বৃহৎ মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে এবং ভোটারদের অর্ধেকই হিস্পানিক, সেখানে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন তার প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মারশালকে ১৩ পয়েন্টে পরাজিত করেছেন; অথচ মাত্র দুই বছর আগেই এই কাউন্টিতে ট্রাম্প ৩৯ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস) তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়া আসনগুলোর সবকটিতেই জয় তুলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জয়ের সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি ডিস্ট্রিক্ট পুনরায় সীমানা নির্ধারণ করার যে অভূতপূর্ব কৌশল নিয়েছিল, তা-ও বাস্তবে কাজ করেনি। বেশির ভাগ টার্গেট করা আসনেই ডেমোক্র্যাটরা তাদের জয় সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের ওপর একধরনের রেফারেন্ডাম বা জনমত জরিপ হিসেবে ধরা হয়, আর ট্রাম্প নিজেও সেই ধারণাকেই উসকে দিয়েছিলেন। প্রচারণার শেষ সপ্তাহে তিনি ডজন ডজন রাজনৈতিক সমাবেশ করেন এবং সমর্থকদের ক্রমাগত বলতে থাকেন যেন তারা ট্রাম্প নিজেই ব্যালটে আছেন এমনটা ভেবে ভোট দেন। তা ছাড়া বেশ কিছু আসনে দলের আপত্তি সত্ত্বে তিনি নিজের পছন্দের বিতর্কিত প্রার্থীদের টিকিট পেতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিলেন। টেক্সাসে তিনি বর্তমান সিনেটর জন কর্নিনকে বাদ দিয়ে কেলেঙ্কারিতে জড়ানো স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আবার সাউথ ক্যারোলিনায় এ বছর সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আকস্মিক মৃত্যুর পর রাজনীতিতে একেবারেই নতুন মুখ তার বোন ডারলিন গ্রাহামকে ট্রাম্পের নির্দেশে প্রার্থী করা হয়েছিল; কিন্তু ভোটাররা এই দুই প্রার্থীর কাউকেই গ্রহণ করেননি।
এমনকি যেসব রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের প্রভাব থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন, তারাও ভোটারদের অসন্তোষ থেকে রক্ষা পাননি। মেইনে দীর্ঘ ৩০ বছরের সিনেট ক্যারিয়ারের অবসান ঘটেছে বর্ষীয়ান রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের, যিনি ট্রাম্পের নীতি থেকে নিজেকে আলাদা দাবি করেও পরাজয় এড়াতে পারেননি।
অন্যদিকে মিশিগানে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট ও মিশরীয়-আমেরিকান বংশোদ্ভূত আব্দুল এল-সায়েদ ইতিহাস গড়ে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন। ট্রাম্প-সমর্থিত সাবেক কংগ্রেসের সদস্য ও এফবিআই এজেন্ট মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণায় রজার্স তাকে ধর্মীয় চরমপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা করেছিলেন। জয়ের পর উল্লাসিত সমর্থকদের উদ্দেশে এল-সায়েদ বলেন, প্রতিপক্ষ ঘৃণার রাজনীতিকে বেছে নিয়েছিল, কিন্তু মিশিগানের মানুষ আশার পথকে বেছে নিয়েছে।
নির্বাচনের রাতে যখন একের পর এক রাজ্য থেকে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের খবর আসতে থাকে এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি লেখেন, এই ব্যালটে তিনি নিজে প্রার্থী ছিলেন না, আর যদি থাকতেন তবে রিপাবলিকানরাই বিশাল ব্যবধানে জয়ী হতো।
তবে বুথফেরত জরিপের তথ্য ট্রাম্পের এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। বেশির ভাগ মার্কিন সংবাদমাধ্যমের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি ভোটার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রকাশ্য ধিক্কার ও ক্ষোভ জানাতেই এই নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার জানিয়েছেন যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা চরম হতাশাগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ। উপরন্তু, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জন ভোটার স্পষ্ট জানিয়েছেন যে ট্রাম্পের একক ক্ষমতার ওপর লাগাম টানতে কংগ্রেসে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে একটি ভারসাম্য থাকা জরুরি।
জয়ের পর জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন অসফ সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, মার্কিন জনগণ তাদের স্পষ্ট রায় দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অপশাসন, দুর্নীতি ও ব্যর্থতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এই নির্বাচন একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। জর্জিয়া রাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস মার্কিন ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। আবার ফ্লোরিডায় বায়রন ডোনাল্ডস বিজয়ী হয়ে দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে জিনা হিনোজোসা টেক্সাসের প্রথম ল্যাটিনা এবং জেভিয়ার বেসেরা ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম ল্যাটিনো গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। সমুদ্রঘেঁষা রাজ্য মিসিসিপি এবং আলাস্কার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফলাফল এখনো ঘোষণা না হলেও, ট্রাম্পের রক্ষণশীল রাজনীতির ওপর আঘাত হেনে মার্কিন কংগ্রেসের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যে সম্পূর্ণ বদলে গেছে, তা এখন সুনির্দিষ্ট।
সূত্র: রয়টার্স
