সত্যিই কি ইসরায়েলকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প?

অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলগত জোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দেশটির নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রকাশ্য মতপার্থক্য ও কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ইসরায়েল থেকে দূরত্ব তৈরি করছে?

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি চাপের মুখে থাকলেও সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা এখনও খুবই ক্ষীণ।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর
বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময় পার করছেন। চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকির পাশাপাশি দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ডের আশঙ্কাও রয়েছে।

একই সময়ে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা এবং দক্ষিণ লেবাননে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থানের পার্থক্য নেতানিয়াহুর ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আলোচনায় তেহরান দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়টিকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে তুলেছে। ফলে এ ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে মতবিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের অবনতি
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপ দুই নেতার সম্পর্কের টানাপোড়েনকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। ফাঁস হওয়া ওই ফোনালাপের সত্যতা রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অস্বীকার করেনি হোয়াইট হাউস।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সংঘাত দ্রুত শেষ করতে আগ্রহী ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধে অনীহা দেখানোর জন্য নেতানিয়াহুকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন।

এমনকি তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলেও আখ্যা দেন এবং বলেন, তার হস্তক্ষেপ না থাকলে নেতানিয়াহু ইতোমধ্যেই কারাগারে থাকতেন। ফোনালাপে ট্রাম্প নাকি আরও বলেন, “এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এই যুদ্ধের কারণে সবাই ইসরায়েলকেও ঘৃণা করছে।”

গত সপ্তাহে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “নেতানিয়াহু জানেন, আসল সিদ্ধান্ত কে নেয়।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য দুই নেতার সম্পর্কে অস্বাভাবিক উত্তেজনারই ইঙ্গিত বহন করে।

মার্কিন প্রশাসনের কড়া বার্তা
গত জুনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, বর্তমানে বিশ্বে ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে সহানুভূতিশীল নেতা হলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

তবে একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের কয়েকজন মন্ত্রীর সমালোচনার জবাবে সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলকে রক্ষা করা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুই-তৃতীয়াংশ অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে তৈরি হয়েছে এবং সেগুলোর ব্যয় বহন করেছেন মার্কিন করদাতারা।

এই বক্তব্যকে অনেকেই ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।

‘মাগা’ শিবিরেও বাড়ছে অসন্তোষ
শুধু মার্কিন সাধারণ জনগণই নয়, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন (মাগা)’ আন্দোলনের একটি অংশও এখন ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনের বিরোধিতা করছে।

একসময়ের ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিন প্রকাশ্যেই ইসরায়েলকে সমর্থনের সমালোচনা করেছেন।

ডানপন্থী ভাষ্যকার ও সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন আরও একধাপ এগিয়ে দাবি করেন, ইসরায়েল ট্রাম্পকে ইরানে হামলা চালাতে প্রভাবিত করেছিল, যাতে পরবর্তীতে লেবাননের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযান চালানো যায়।

কার্লসনের ভাষায়, ট্রাম্প এখন বুঝতে পেরেছেন যে, তার প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত ঝুঁকির একটি হয়ে উঠেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ওয়াশিংটনভিত্তিক জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর গবেষক ড্যানিয়েল বাইম্যানের মতে, ট্রাম্প চাইলে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের রাজনৈতিক সক্ষমতা রাখেন।

তার ভাষায়, “রিপাবলিকান পার্টি ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলপন্থী হলেও ট্রাম্পের নিজস্ব শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। তিনি চাইলে দলের বড় অংশকেই নিজের অবস্থানের পক্ষে আনতে পারবেন। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একটি বড় অংশও এখন ইসরায়েলের সমালোচনায় ক্রমেই সোচ্চার হচ্ছে।”

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ১০ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এটি অন্য কোনও দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা চুক্তি।

এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। গাজা যুদ্ধের সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের পক্ষে অন্তত ছয়বার ভেটো দিয়েছে ওয়াশিংটন।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধীদের আক্রমণ
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহুর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছে।

সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার কারণে ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, “এই সরকারকে দ্রুত পরিবর্তন করতে না পারলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কার্যত ধ্বংস হয়ে যাবে।”

অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট, যিনি আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, অভিযোগ করেছেন যে, নেতানিয়াহুর ভুল কূটনীতির কারণে ট্রাম্প ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে একাই ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছেন।

বিচ্ছেদের সম্ভাবনা কতটা?
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, “যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থানের মূল ভিত্তি। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক সমর্থন- সব ক্ষেত্রেই ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।”

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও লেখক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, অতীতেও মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ইসরায়েলি নেতাদের মতবিরোধ হয়েছে। তবে বর্তমান প্রশাসনের মতো প্রকাশ্যে এত কঠোর ভাষায় সমালোচনা আগে খুব কমই দেখা গেছে।

তার ভাষায়, “আজকের যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে- রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের ভোটারদের কাছেই- ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় কম।”

তবে সব উত্তেজনা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনও পরিকল্পনা করছে- এমন কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।

মিলারের মতে, “ট্রাম্প যদি কখনও ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে সেটি এমন কোনও কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের জন্য হবে, যা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করবে।”

তার মূল্যায়ন, লেবানন, গাজা কিংবা ইসরায়েল-সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ- কোনও ক্ষেত্রেই এখন এমন অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই, যার জন্য ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর চাপ প্রয়োগ করবে।

ফলে বর্তমান উত্তেজনা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি আপাতত অটুটই থাকবে বলে মনে করছেন অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights