অনিচ্ছাকৃত ঋণ পুনঃ তফসিল না হলে কর্মসংস্থান কমবে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ঋণ পর্যালোচনা কমিটির সদস্য হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বেশির ভাগ ঋণ মন্দ হয় মূলত প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঋণ দিয়ে দিলে, উদ্যোক্তা ব্যবসা থেকে অনুপস্থিত থাকলে বা অন্যকে দিয়ে ব্যবসা চালালে, রাজনৈতিক নিষ্পেষণ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো কারণে, ব্যবসায়ের মডেল ভুল হলে, মূল উদ্যোক্তার অকালমৃত্যু হলে, ব্যবসার কৌশল ভুল হলে বা গ্রাহক তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হলে।

আমরা এমনও দেখেছি যে প্রদত্ত ঋণের বৃহদাংশ ত্বরিত পাচার হয়ে গেছে বা ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি। অনেক সময় ঋণঝুঁকি পর্যালোচনায়ও ভুল হয়। অতিরিক্ত টাকা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যায় আর ফেরে না। এমনকি ঋণ নিয়ে দুর্নীতিও হয়। অনেক গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানেরই হিসাব ব্যবস্থাপনা দুর্বল মানের।

১ বা ২ পার্সেন্ট ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল হলে ঋণটি একটি চলমান ঋণ হয়ে যাওয়ায় তার বিপরীতে হয়তো প্রভিশন রাখতে হয় না, ঋণ চলমান থাকে, মুনাফা বেশি দেখানো যায়, সরকার রাজস্ব পায় এবং মালিকরা ডিভিডেন্ড পান। বেশি কর্মসংস্থান সক্ষম কিংবা রপ্তানিমুখী বৃহৎ উদ্যোক্তাদের ঋণ পুনঃ তফসিল বা নিয়মিত না করা হলে দরিদ্র এই দেশে কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সে ক্ষেত্রে বৃহৎ ও ভালো ব্যবসায়ীদের উপযুক্ত সহায়তায়ও ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
সত্যিকার আপৎকালে ঋণ পুনঃ তফসিল বা পুনর্গঠন অনেক দেশেই প্রচলিত আছে বা হয়। তবে মন্দ ঋণ বারবার রিশিডিউল হলে, ব্যাংকের নতুন ঋণদানের ক্ষমতা কমে, ভালো ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহ হন এবং সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশেষ গোষ্ঠীর ঋণ বারবার পুনঃ তফসিল করা থেকে আমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

প্রচুর খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল বা বিনিয়োগকারীদের মাঝে নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয়। ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে অনেক টাকা আটকে গেলে ছোট গ্রাহকরাও বঞ্চিত হন। সব কিছুর পরও দেখতে হবে দেশ এখন বিনিয়োগ খরায় ভুগছে। এখন অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা দরকার। শিল্প-কারখানা সচল করা দরকার।

করোনা ও যুদ্ধসহ নানা কারণে অনেক বড় গ্রুপ যারা বিপদে পড়েছে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হয়েছে, তারা যদি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে উদ্যোগী হয় তাদের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রাখা যায়। এতে দেশের লাভ আবার ব্যাংকও খেলাপির খাতায় থাকা ঋণের একটি অংশ ফেরত পায়। পর্যালোচনা করে ব্যাংকগুলো এই সুযোগ নিতে পারে।

লেখক : ব্যাংকার ও চেয়ারম্যান, ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights