চীনের হাত ধরে গৌরবে ফিরতে চায় রাজশাহীর রেশম

এক সময় রাজশাহীর রেশম ছিল আভিজাত্য, সৌন্দর্য ও বাঙালির ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচয়। সময়ের সঙ্গে নানা সংকটে সেই শিল্পের জৌলুস অনেকটাই ম্লান হয়েছে। তবে গবেষণা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন উদ্যোগে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে রাজশাহীর রেশম।

বিশেষ করে চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি রেশম রপ্তানির সম্ভাবনা এই শিল্পের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন দিগন্ত। এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে রাজশাহীতে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে রেশম চাষ গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম।

এর আগে তিনি বাংলাদেশ রেশম কারখানা এবং রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট পরিদর্শন। সম্মেলনে চীনের বাজারে রেশম রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পকে আধুনিকায়ন এবং এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকার মাঠপর্যায়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি রেশম চাষের পদ্ধতি উন্নয়ন, তুঁত চাষের প্রসার এবং রেশম সুতার গুণগত মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, রাজশাহীর রেশম কেবল একটি শিল্প নয়, এটি দেশের ঐতিহ্য ও গর্বের অংশ। সরকার আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার পাশাপাশি বাজারের পরিধি বাড়ানো এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা আছে। রাজশাহীর রেশম শিল্পের উন্নয়নে মার্কেটিং পলিসি উন্নয়নের কাজও চলছে। চীনের বাজার বাংলাদেশের রেশম শিল্পের জন্য সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। বিশ্বের অন্যতম বড় রেশম উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ চীনের বাজারে বাংলাদেশি রেশমের আলাদা অবস্থান তৈরি করতে পারলে এর সুফল সরাসরি পৌঁছাতে পারে রাজশাহীর রেশম চাষি, তাঁতি ও উদ্যোক্তাদের কাছে। মানসম্মত রেশম সুতা ও কাপড় উৎপাদনের পাশাপাশি আধুনিক নকশা, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং ও বিপণন কৌশল গ্রহণ করা গেলে ‘রাজশাহী সিল্ক’ আন্তর্জাতিক বাজারে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ আছে। সম্মেলনে রেশম শিল্পের ঐতিহাসিক গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘রাজশাহী সিল্ক বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে রেশম শিল্পকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য নিয়েছে। রাজশাহীর রেশম শিল্পে উৎপাদনের চিত্রও আশার কথা বলছে। ২০১৮ সালে পুনরায় চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারখানায় মোট ৫৯ হাজার ৪৬৮ মিটার রেশম কাপড় উৎপাদিত হয়েছে। কারখানার নিজস্ব শোরুমে ঐতিহ্যবাহী গরদ শাড়ি, প্রিন্টেড শাড়ি, পাঞ্জাবির কাপড় ও বলাকা সিল্কসহ বিভিন্ন উন্নতমানের রেশম পণ্য সরাসরি বিক্রি করা হচ্ছে।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৬ আসনের এমপি আবু সাঈদ চাঁদ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, ঝেজিয়াং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ও ভাইস ডিন অধ্যাপক জু কিউজি এবং চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প উদ্যোক্তা ও প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক নুসরাত জাহান নিপা। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক তৌফিক আল মাহমুদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মো. শাখাওয়াত হোসেন। চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্র সম্মেলনটির আয়োজন করে এবং সহযোগিতা করে বাংলাদেশ রেশম চাষ উন্নয়ন বোর্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights