জাপানের রাজকন্যাকে সিংহাসনে বসানোর দাবি কেন জোরদার হচ্ছে?
অনলাইন ভার্সন
পত্রিকার ম্যাগাজিন কভারে তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ। তিনি যেসব পোশাক পরিধান করেন, তা নিমেষেই অনলাইনে নিমিষেই বিক্রি হয়ে যায়। সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত হলে কিংবা তীব্র দাবদাহের মধ্যে বাইরে এলে বিপুল ভক্তের আগমন ঘটে। উদ্দেশ্য শুধুই একঝলক দেখা। তার ‘রাজকীয় গাভীর্য, সৌন্দর্য এবং প্রভাবের’ প্রশংসায় পঞ্চমুখ পুরো দেশ। কথা হচ্ছে জাপানের ২৪ বছর বয়সী রাজকন্যা আইকোকে নিয়ে, যিনি দেশটির রাজপরিবার পরিবারের সবচেয়ে জনপ্রিয় সদস্য। অথচ, দেশটির বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তিনি কখনোই জাপানের সম্রাজ্ঞী বা রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবেন না। জাপানের রাজপরিবারে সদস্য সংকট যখন চরম আকার ধারণ করছে, তখন দেশটির সাধারণ মানুষ ক্রমেই একটি প্রশ্ন বড় করে তুলছেন, কেন রাজনকন্যা আইকোকে সিংহাসনে বসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না?
জাপানের বর্তমান সম্রাট নারুহিতো এবং সম্রাজ্ঞী মাসাকোর একমাত্র সন্তান আইকো। এককালের লাজুক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে সংবাদমাধ্যম ও জনসমক্ষে সাবলীল এক তরুণীতে রূপান্তরের পথপরিক্রমায় তার এই জনপ্রিয়তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে। প্রায় ১৪০ বছর আগে প্রবর্তিত এবং ১৯৪৭ সালে সংশোধিত আইন অনুযায়ী, জাপানের ‘চন্দ্রমল্লিকা সিংহাসনে’ (ক্রিসান্থেমাম থ্রোন) নারীদের আরোহণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। তবে এই সরকারি অবস্থান বা আইনের সঙ্গে বিপুল জনমতের কোনো মিল নেই। জনমতে সুস্পষ্ট সমর্থন রয়েছে যেন একজন নারী সিংহাসনে আরোহণ করতে পারেন এবং আসন্ন উত্তরাধিকার সংকট দূর করতে আইন সংশোধন করা হয়।
পুরো দেশজুড়ে যে তীব্র জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সংকট বা বয়োবৃদ্ধির হাওয়া বইছে, রাজপরিবারও এর বাইরে নয়। তিন দশক আগে যেখানে রাজপরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৩০ জন, সেখানে বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬ জনে। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা মাত্র পাঁচ। রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও সাধারণ জাপানিদের একটি বড় অংশ আইনে পরিবর্তন চান। চলতি বছরের এপ্রিলে মাইনিচি শিমবুন প্রত্রিকা পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ মানুষ কোনো নারীকে সম্রাট হিসেবে দেখতে চান, যেখানে মাত্র ১০ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন।
১৮৮৯ সালের মেইজি যুগের আইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং ১৯৪৭ সালে পাস হওয়া এই পুরুষ-ভিত্তিক উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তনের তীব্র চাপের মুখে পড়েছে দেশটির সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল সরকার। ১৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই সাম্রাজ্যে পুরুষ উত্তরাধিকারীর তীব্র ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে পথ খুঁজতে হচ্ছে। বর্তমানে রাজসিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে সারিতে রয়েছেন মাত্র তিনজন; সম্রাট নারুহিতোর ছোট ভাই ক্রাউন প্রিন্স আকিশিনো, তার ছেলে প্রিন্স হিসাহিতো এবং সম্রাটের ৯০ বছর বয়সী চাচা প্রিন্স হিটাচি। রাজপরিবারে বিগত চার দশকের মধ্যে জন্ম নেওয়া একমাত্র পুরুষ সদস্য ২০ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী প্রিন্স হিসাহিতোর যদি কোনো পুত্রসন্তান না হয়, তবে এক প্রজন্মের মধ্যেই এই ঐতিহ্যবাহী রাজবংশের ধারাবাহিকতা সমাপ্তির মুখে পড়বে।
পূর্বে বেশ কয়েকটি সরকার এই জটিলতার অবসান ঘটাতে রাজপ্রাসাদে লিঙ্গসমতা আনার কথা চিন্তা করেছিল এবং আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের প্রবল চাপ এবং ২০০৬ সালে হিসাহিতোর জন্মের পর সেই আলোচনা থমকে যায়। তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও তার রক্ষণশীল সহযোগীরা এমন কিছু আইনি সংশোধন এনেছেন, যা আগামী কয়েক প্রজন্মের জন্য পুরুষ-ভিত্তিক উত্তরাধিকারকে সুরক্ষার চাদরে ঢেকে দেবে। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। এই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে রাজপরিবারের নারীরা সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলেও তাদের রাজকীয় পদবি ও মর্যাদা ধরে রাখতে পারবেন। পাশাপাশি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজপরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ১১টি ‘শাখা পরিবার’-এর পুরুষ বংশধরদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে, কোনো অবিবাহিত এবং ১৫ বছরের বেশি বয়সী দূর সম্পর্কের পুরুষ আত্মীয়কে রাজপরিবারে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। পরবর্তীতে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পুত্রসন্তানের জন্ম দিলে সেই সন্তান সরাসরি সিংহাসনের উত্তরাধিকারের তালিকায় যুক্ত হবেন।
জাপানের এই রাজকীয় সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর কেড়েছে। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের নারীদের অধিকার বিষয়ক কমিটি জাপানি সরকারকে নারী সম্রাটকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায়। যদিও টোকিও সেই আহ্বানকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘অনভিপ্রেত’ আখ্যা দিয়ে খারিজ করে দেয় এবং দাবি করে যে, রাজকীয় উত্তরাধিকার জাপানের ‘মৌলিক জাতীয় পরিচয়ের’ অংশ।
জাতিসংঘ এবং জাপানের জনমত যেন ধাক্কা খাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির কট্টর রক্ষণশীল আদর্শের দেয়ালে। জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি উত্তরাধিকার বিতর্ক চলাকালে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, রাজপরিবারের ধারাবাহিকতা টানা ১২৬ প্রজন্ম ধরে পুরুষ বংশানুক্রমে বজায় রাখার অনন্য ঐতিহাসিক তথ্যই সম্রাটের কর্তৃত্ব ও বৈধতার মূল ভিত্তি। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এই সংশোধনীগুলোর উদ্দেশ্য কেবল সদস্য সংকট কিছুটা শিথিল করা, নারী সম্রাট নিয়োগের বিতর্কের চিরস্থায়ী নিষ্পত্তি করা নয়।
তবে টোকিওর চুও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজকীয় বংশানুক্রম ও উত্তরাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাকোতো ওকাওয়া মনে করেন, এই আইন সংশোধন স্পষ্টভাবে পুরুষ-ভিত্তিক উত্তরাধিকারকে টিকিয়ে রাখার দিকেই নির্দেশ করে। তা সত্ত্বেও, আইকোর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সরকারকে পুনর্ভাবনায় বাধ্য করতে পারে। অধ্যাপক ওকাওয়া আরও বলেন, কেবল নারী হওয়ার কারণে কাউকে সিংহাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকেই রাজকন্যা আইকোকে ছোটবেলা থেকে বড় হতে দেখেছেন। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সরকারি কর্মসূচিতে তিনি যে সংযম, মর্যাদা ও মার্জিত আচরণ উপস্থাপন করেছেন, তা জনসমর্থন বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মানুষ তাকে সম্রাট নারুহিতোর আদর্শের প্রতীক হিসেবে দেখছেন; যিনি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকেন।
আইকোর অনুরাগী জিন, যিনি ইনস্টাগ্রামে যুবরানিকে নিয়ে একটি জনপ্রিয় পেজ পরিচালনা করেন, ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে সরকার বিপুল জনগণের মতামতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে। তার দৃষ্টিতে, আইকো সিংহাসনে বসার জন্য সব দিক থেকে যোগ্য। তিনি বলেন, তিনি সম্রাটের একমাত্র সরাসরি বংশধর এবং তার চরিত্র ও রাজকীয় ব্যক্তিত্ব সর্বোচ্চ মানের। জাপানের প্রতীক হওয়ার মতো যোগ্যতা আইকোর পুরোপুরি রয়েছে।
তবে আইকো কিংবা রাজপরিবারের অন্য কোনো নারী সিংহাসনে আরোহণ করলে তা একেবারে অভূতপূর্ব ঘটনা হবে না। অতীতে জাপানে আটজন নারী সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন, যদিও তাদের মূল ভূমিকা ছিল কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারীর জন্ম না হওয়া পর্যন্ত সিংহাসন রক্ষা করা। ১৭৬২ থেকে ১৭৭০ সাল পর্যন্ত শাসন করা সম্রাট গো-সাকুরামচি ছিলেন জাপানের সর্বশেষ নারী শাসক।
এদিকে রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেও রাজপরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাষার মাধ্যমে এই পরিস্থিতির প্রতি অসন্তোষের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে সম্রাট নারুহিতো বলেন, আমি আশা করি রাজপরিবারের সদস্য সংখ্যা নিশ্চিত করার জন্য পার্লামেন্টে যেভাবে আলোচনা হচ্ছে, তা জনগণের বোধগম্যতা অর্জন করবে। আর সম্রাটের ছোট ভাই আকিশিনো আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেন, সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা জরুরি। আমি বিশ্বাস করি রাজপরিবারের দায়িত্ব হলো সমাজের চাহিদার সাড়াদান করা। আমি মনে করি না এই বিষয়ে নারী বা পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
