ধান চাষে বন উজাড় বন্ধের ঘোষণা ইন্দোনেশিয়ার

মধ্য কালিমান্টানের কালুম্পাং-এ সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ধান উৎপাদন সহায়তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ধান চাষের জন্য বনভূমি পরিষ্কার করা হয়েছিল। গভীর পিট মাটির ওপর অবস্থিত হওয়ার কারণে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়। ছবি: স্ট্রেইটস টাইমস

ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই অর্জনের দাবি করে নতুন ধানখেত তৈরিতে বন উজাড়ের নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। তবে দক্ষিণ পাপুয়া ও কালিমান্তানের মতো অঞ্চলে ইতোমধ্যে শুরু হওয়া প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট করেনি দেশটির সরকার।

মঙ্গলবার জাকার্তায় একটি টেকসই উন্নয়নবিষয়ক ফোরামে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তোর ছোট ভাই ও জলবায়ু এবং জ্বালানি-বিষয়ক বিশেষ দূত হাসিম জোজোহাদিকুসুমো বলেন, সরকার নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য অর্জন করেছে। এ জন্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০ লাখ হেক্টর জমিতে ‘ফুড এস্টেট’ বা বৃহৎ খাদ্য উৎপাদন এলাকা গড়ে তুলতে হয়নি।

হাসিম বলেন, তথাকথিত বনাঞ্চলে ধান চাষের জন্য আর নতুন করে জমি সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখছে না সরকার।
তিনি বলেন, “সরকার মনে করে, তথাকথিত বনাঞ্চলে ধান চাষ আর সম্প্রসারণের প্রয়োজন নেই।”

হাসিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ লাখ হেক্টর জমিতে খাদ্য উৎপাদনের যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে সেটির লক্ষ্য ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে।

তিনি বলেন, “এটি এমন একটি কর্মসূচি, যা আমরা ২০ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ না করেই অর্জন করেছি।”

তবে সরকারের এই নীতিবদলের ব্যাখ্যা নিয়ে এখনও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বন মন্ত্রণালয় বলছে, হাসিমের বক্তব্যকে এমন একটি নীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং বিদ্যমান কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা। বন সংরক্ষণের প্রচেষ্টার সঙ্গেও এই নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে ইতোমধ্যে যেসব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, সেগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে কি না, তা এখনও বলা যাচ্ছে না।
বন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাবিষয়ক প্রধান রিস্তিয়ান্তো প্রিবাদি দ্য স্ট্রেইটস টাইমসকে বলেন, “নতুন সম্প্রসারণ পরিকল্পনা, যার জন্য বনাঞ্চল উজাড় করতে হবে; ইতোমধ্যে চলমান কার্যক্রম; এবং বিদ্যমান কৃষিজমিতে উৎপাদন বাড়ানো- এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।”

তিনি বলেন, “তাই দক্ষিণ পাপুয়া ও মধ্য কালিমান্তানে চলমান সব কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে- এ কথা এখনও বলা যায় না। কখন সেগুলো বন্ধ হবে, সেটিও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।”

এ বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থাকেই দিতে হবে বলে জানান তিনি।

২০ লাখ হেক্টরের খাদ্য প্রকল্প নিয়ে নতুন অবস্থান
ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে ২০ লাখ হেক্টর জমিতে ‘ফুড এস্টেট’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল। এর অংশ হিসেবে নতুন ধানখেত তৈরির জন্য বিভিন্ন এলাকায় বনাঞ্চল পরিষ্কারের কাজও শুরু হয়।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের উপপ্রধান মারি এলকা পাঙ্গেস্তু ফোরামে বলেন, ২০২৫ সালে ঘোষিত ২০ লাখ হেক্টরের খাদ্য উৎপাদন কর্মসূচি ‘এখন আর প্রয়োজন নেই’।

তিনি বলেন, হাসিম তাকে এই ঘোষণার ‘অসম্পূর্ণ অংশটি’ তুলে ধরতে বলেছেন।

মারি জানান, ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের জন্য বন পরিষ্কার না করে অবক্ষয়িত বা ক্ষতিগ্রস্ত জমি ব্যবহার করা হবে। ইন্দোনেশিয়ায় এ ধরনের জমির পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ হেক্টরের বেশি বলে জানান তিনি।

এসব জমির অনেকটাই আগে পরিষ্কার করা হয়েছিল কিংবা ক্ষয়, ভূমির অবনতি বা অন্য কোনও কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে এসব জমির কিছু পরিত্যক্ত, আবার কিছু জমি খুব কম ব্যবহার করা হচ্ছে।

মারি বলেন, হাসিম কৃষি ও বনমন্ত্রীদের সঙ্গে এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং তারা এতে সম্মত হয়েছেন। ভবিষ্যতে খাদ্য কিংবা জৈব জ্বালানি উৎপাদনের জন্য অবক্ষয়িত জমি ব্যবহারের পাশাপাশি বন মন্ত্রণালয়ের পুনঃবনায়ন কর্মসূচিও চালানো হবে।

ইন্দোনেশিয়ায় জৈব জ্বালানির মধ্যে পাম তেলের সঙ্গে ডিজেল মিশিয়ে তৈরি বায়োডিজেল এবং আখ থেকে তৈরি ইথানল অন্যতম।

‘অবক্ষয়িত জমি’ হলেই সেখানে চাষ করা যাবে না
তবে অবক্ষয়িত জমিকে নতুন কৃষিজমিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার ওপর জোর দিয়েছে বন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা রিস্তিয়ান্তো বলেন, আখ বা সয়াবিনের মতো ফসলের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে বন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা যাবে না।

কোনও জমিকে কৃষি বা অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য নির্বাচনের আগে সেখানে বর্তমানে কী ধরনের ভূমি আচ্ছাদন রয়েছে, জমিটির আইনি অবস্থান ও কার্যকারিতা কী, তা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি স্থানিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য, পরিবেশগত বিষয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার- বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার- বিবেচনায় নিতে হবে।

রিস্তিয়ান্তো বলেন, কোনও এলাকাকে ‘অবক্ষয়িত জমি’ হিসেবে চিহ্নিত করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য কাজে রূপান্তরের উপযোগী হয়ে যায় না।

জমির ব্যবহার পরিবর্তন করতে হলে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান মেনে চলতে হবে বলেও তিনি জানান।

তার ভাষায়, “খাদ্যনিরাপত্তা ও বন সংরক্ষণকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। এর জন্য কোন এলাকায় কী করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্টতা এবং সমন্বিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।”

নতুন জমি নয়, বিদ্যমান জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য
নতুন বনাঞ্চল পরিষ্কার করে কৃষিজমি বাড়ানোর বদলে বর্তমানে যে কৃষিজমি রয়েছে, সেখানেই উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন হাসিম ও মারি।

হাসিম বলেন, ধানের পাশাপাশি সয়াবিন উৎপাদনেও এ নীতি প্রয়োগ করা হবে। ইন্দোনেশিয়া এখনও সয়াবিনের বড় অংশ আমদানি করে।

তিনি বলেন, “আমরা আবাদযোগ্য এলাকা সম্প্রসারণের জন্য বন পরিষ্কার করব না। বরং নতুন জাত, নতুন বীজ এবং উন্নতমানের ধান ও সয়াবিনের বীজ ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ চালিয়ে যাব।”

হাসিমের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, প্রায় তিন বছরের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া সয়াবিন উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।
তবে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না বলে সতর্ক করেছেন মারি। তিনি বলেন, শুধু ফলন বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে মাটি ও পানির গুণমান নষ্ট হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

তার মতে, এমন বীজ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন, যেগুলোর পানির চাহিদা কম এবং বেশি তাপমাত্রার মধ্যেও ভালো ফলন দিতে পারে।

‘গ্রিন রাইস’ চাষে নজর
উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন রাইস’ বা সবুজ ধান চাষের কথাও তুলে ধরেছেন মারি। একই জমিতে কম পানি ও কম সার ব্যবহার করে বেশি ধান উৎপাদনের এই পদ্ধতি মিথেন নিঃসরণ কমাতে পারে। পাশাপাশি এ ধরনের কৃষিপদ্ধতির মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগও রয়েছে।

মারি বলেন, ভিয়েতনামে এ ধরনের পদ্ধতির কার্যকারিতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার নতুন নীতিতে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- ইতোমধ্যে বন উজাড় করে শুরু হওয়া খাদ্য প্রকল্পগুলোর কী হবে। সরকার নতুন করে বন পরিষ্কার না করার নীতির কথা বললেও দক্ষিণ পাপুয়া ও মধ্য কালিমান্তানে চলমান প্রকল্পগুলোর বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত জানায়নি।

ফলে বন সংরক্ষণ ও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, এবং বিদ্যমান ‘ফুড এস্টেট’ প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে- তা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সূত্র: স্ট্রেইটস টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights