বগুড়ায় দইয়ের হাড়িতে টিকে আছে মৃৎশিল্পীরা
মামুনুর রশিদ, বগুড়া
প্লাস্টিক, সিরামিক ও মেলামাইনের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি ঐতিহ্যবাহী তৈজসপত্র। একসময় হাঁড়ি, পাতিল, কলস, ঢাকনা, থালা, পুতুলসহ নানা ধরনের মাটির সামগ্রী তৈরি করতেন পাল সম্প্রদায়ের মৃৎশিল্পীরা। এ সব পণ্যের চাহিদা কমে এলেও বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ও ডেমাজানী পালপাড়ায় দইয়ের সরা ও হাড়ি তৈরির ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। এই শিল্পকে ঘিরেই জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক পাল পরিবারের সদস্যরা। তবে সময়ের পরিবর্তনে সরা তৈরির পদ্ধতিতেও এসেছে যান্ত্রিকতার ছোঁয়া।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার আড়িয়া ও ডেমাজানী পালপাড়ার কারিগররা দইয়ের সরা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ করছেন। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ মোটরচালিত চাকায় সরা তৈরি করছেন, আবার কেউ সেগুলোতে ঘষামাজা, রংয়ের প্রলেপ দেওয়া, শুকানো ও পোড়ানোর কাজ করছেন। আগে সম্পূর্ণ হাতে তৈরি করা হলেও এখন বিদ্যুৎচালিত মোটর ও মেশিনের সাহায্যে কম সময়ে বেশি সরা বা মাটির জিনিসপত্র তৈরি করছেন। প্রথমে মেশিনে মাটি দিয়ে সরা বা পাত্রের কাঠামো তৈরি করা হয়। পরে হাতে ঘষামাজা ও প্রলেপ দিয়ে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়ানো হয়। মেশিনের সাহায্যে কারিগরদের শ্রম কিছুটা কমলেও মাটি ও জ্বালানিসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। তবে এখনো কয়েকজন প্রবীণ কারিগর সম্পূর্ণ হাতে সরা তৈরির পুরোনো পদ্ধতিই ধরে রেখেছেন।
সরা তৈরির কারিগর সুভাষ চন্দ্র পাল বলেন, আগে মাটির কুপি, পাতিল, কলস, ঢাকনা, থালা, পুতুলসহ নানা ধরনের মাটির জিনিস তৈরি করতাম। এখন সেসবের চাহিদা নেই বললেই চলে। দইয়ের সরার চাহিদা থাকায় এখনো আমরা এ পেশায় টিকে আছি। বগুড়াসহ সারাদেশে দইয়ের হাঁড়ি ও সরার চাহিদা রয়েছে।
জোৎসা রাণী পাল বলেন, মেশিনের সাহায্যে দিনে ২০০ থেকে ২৫০টি মাটির সরা তৈরি করতে পারি। প্রতিটি সরা তৈরির মজুরি হিসেবে প্রতি পিচ ২ টাকা করে পাই। এরপর সেগুলো মাটির রং করে রোদে শুকিয়ে আগুনে দিতে হয়।
আরেক কারিগর শংকর পাল বলেন, প্রতি সরা ১২ থেকে ১৩ টায় বিক্রি করে থাকি। মাটি, লাকড়ি, খড়, রং ও শ্রমিকের মজুরি সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় আয় বাড়েনি। বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখতেই এখনো তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন।
বগুড়ার দইয়ের খ্যাতির সঙ্গে টিকে আছে মাটির হাঁড়ির চাহিদা। সারাদেশে বগুড়ার দইয়ের সরা ও হাঁড়ির বেশ কদর রয়েছে।
দই প্রস্তুতকারক ও মাটির সরা ব্যবসায়ী পরিতোষ চন্দ্র বলেন, মাটির পাত্রে দই তৈরি ও সংরক্ষণের প্রচলন দীর্ঘদিনের। বিকল্প পাত্রের ব্যবহার বাড়লেও মাটির পাত্রে দইয়ের স্বাদ ও মান ভালো থাকে বলে এর চাহিদা এখনো রয়েছে।
আড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান বলেন, আগে পাল পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের মাটির তৈজসপত্র তৈরি করতেন। সময়ের সঙ্গে এসব পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই শুধু দইয়ের সরা তৈরি করছেন। সরকার সহ সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ এদিকে সুনজর দেওয়া উচিৎ।
