যে প্রাণীরা নিজেরাই তাদের চিকিৎসক

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার

অসুস্থ হলে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায়, ওষুধ খায় কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হয়। কিন্তু প্রাণীরা অসুস্থ হলে কী করে? তাদের তো হাসপাতাল নেই, চিকিৎসক নেই, ফার্মেসিও নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রকৃতির অনেক প্রাণী নিজেদের অসুস্থতা বা আঘাত মোকাবিলায় বিশেষ কিছু উদ্ভিদ, মাটি, পোকামাকড় কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে। বিজ্ঞানীরা এই আচরণকে বলেন ‘জুফার্মাকোগনসি’-অর্থাৎ প্রাণীদের নিজস্ব উপায়ে ঔষধি উপাদান নির্বাচন ও ব্যবহার। আফ্রিকার শিম্পাঞ্জির আচরণ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। গবেষকরা দেখেছেন, অসুস্থ বা পরজীবীর আক্রমণে আক্রান্ত শিম্পাঞ্জি কখনো এমন কিছু উদ্ভিদের পাতা ও অংশ খায়, যা তারা সাধারণ সময়ে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে না। কিছু ক্ষেত্রে তারা পুরো পাতা চিবিয়ে না খেয়ে গিলে ফেলে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পাতার বিশেষ রাসায়নিক উপাদান অন্ত্রের পরজীবী নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু শিম্পাঞ্জিই নয়, বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেই এমন আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিছু পাখি বাসা তৈরির সময় নির্দিষ্ট সুগন্ধযুক্ত উদ্ভিদ বা পাতা ব্যবহার করে। এসব উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান বাসায় থাকা পরজীবী বা ক্ষতিকর জীবাণু কমাতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। অর্থাৎ পাখির বাসা শুধু ডিম ও বাচ্চার আশ্রয় নয়, অনেক ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্র’ও হতে পারে।

পিঁপড়ার জগতেও রয়েছে চমকপ্রদ উদাহরণ। কিছু পিঁপড়া ছত্রাকের বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্ভিদজাত উপাদান ব্যবহার করে নিজেদের কলোনিকে রক্ষা করতে পারে। আবার কিছু পোকামাকড় পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হলে এমন খাদ্য বেছে নেয়, যাতে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। কুকুর-বিড়ালকেও নানা রোগে ঘাস বা বিভিন্ন গাছের পাতা খেতে দেখা যায়। অর্থাৎ প্রাণীদের খাদ্য নির্বাচন সব সময় ক্ষুধা মেটানোর জন্য নয়; কখনো কখনো তা হতে পারে রোগ প্রতিরোধের কৌশল। আঘাত পাওয়ার পর প্রাণীদের আচরণও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। কিছু প্রাণী ক্ষতস্থানে নির্দিষ্ট উদ্ভিদজাত পদার্থ প্রয়োগ করে বলে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে। এসব উপাদানের মধ্যে জীবাণুনাশক, প্রদাহনাশক বা ক্ষত নিরাময়ে সহায়ক রাসায়নিক থাকতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে, প্রাণীরা কি সত্যিই জানে কোন উদ্ভিদ ওষুধ হিসেবে কাজ করে? বিজ্ঞানীরা এখনো এর সরল উত্তর দিতে পারেননি। কিছু আচরণ শেখা, কিছু বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি এবং কিছু হয়তো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল। কোনো প্রাণী উপকারী উদ্ভিদ ব্যবহার করে বেঁচে গেলে সেই আচরণ পরবর্তী প্রজন্মে টিকে যেতে পারে। প্রকৃতির এই অদৃশ্য ‘চিকিৎসাবিদ্যা’ মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বহু আধুনিক ওষুধের ধারণা এসেছে প্রকৃতির বিভিন্ন জীব ও উদ্ভিদ থেকে। প্রাণীরা কোন উদ্ভিদ বা প্রাকৃতিক উপাদান নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যবহার করে, তা পর্যবেক্ষণ করে নতুন ঔষধি যৌগ আবিষ্কারের সম্ভাবনাও রয়েছে।

লেখক : পরিবেশ-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights