রাশিয়ায় জাপান টোব্যাকোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত, টোকিওর তীব্র প্রতিবাদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মস্কোতে বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর ক্রেমলিনের ক্রমবর্ধমান কড়াকড়ির সর্বশেষ শিকার হিসেবে এবার আন্তর্জাতিক তামাক জায়ান্ট জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (জেটিআই)-এর রাশিয়ান সম্পদের নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৃহস্পতিবার পুতিন স্বাক্ষরিত একটি ডিক্রি জারির মাধ্যমে উইনস্টন ও ক্যামেলের মতো জনপ্রিয় সিগারেট ব্র্যান্ডের প্রস্তুতকারক এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার মস্কোর বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে টোকিও, যা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুই দেশের টানাপোড়েন সম্পর্ককে আরও চরম উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট পুতিনের স্বাক্ষরিত ডিক্রি অনুসারে, রাশিয়ার বৃহত্তম তামাক উৎপাদক কোম্পানি জাপান টোব্যাকো ইনকরপোরেটেডে (জেটিআই)-এর অধীনে থাকা চারটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের সমস্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এখন থেকে রাশিয়ান কোম্পানি ‌‘ইনডাস্ট্রিয়াল অ্যাসেটস’-এর হাতে ন্যস্ত থাকবে।

উল্লেখ্য, জাপান টোব্যাকো ইনকরপোরেটেডের প্রায় ৩৭ শতাংশ শেয়ারের মালিক স্বয়ং জাপান সরকার। রাশিয়ার এই আকস্মিক পদক্ষেপের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শুক্রবার টোকিও শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারের দামে ধস নামে। বিক্রির হিড়িক ও বিপুল চাপের কারণে দিনের নির্দিষ্ট দৈনিক সীমায় নেমে শেয়ার কেনাবেচা একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়।

রাশিয়ার এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা শুক্রবার আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাপান সরকার সব সময়ই রাশিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে এসেছে যাতে জাপানি নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থ কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না হয়। ইতিমধ্যে এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং এ আদেশ দ্রুত প্রত্যাহারের জোর দাবি জানানো হয়েছে।

ডিক্রিতে সম্পদ বাজেয়াপ্তের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা না হলেও, ক্রেমলিন অতীতে এ ধরনের পদক্ষেপকে রাশিয়ার প্রতি অন্যান্য দেশের ‘অবন্ধুসুলভ আচরণ’-এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে আখ্যা দিয়ে এসেছে। অন্যদিকে এক ইমেইল বার্তায় জেটিআই জানিয়েছে যে, তারা পরিস্থিতির ওপর গভীরভাবে নজর রাখছে এবং নিজেদের কৌশলগত বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে, যেখানে কর্মীদের স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। জেটিআই গ্রুপের মোট রাজস্বের প্রায় ১০ শতাংশ এবং পরিচালন মুনাফার প্রায় ২৫ শতাংশই আসে এই রাশিয়ান ব্যবসা থেকে।

জেটিআই-এর সম্পদ অধিগ্রহণের এই ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে সুইজারল্যান্ডের খাদ্য জায়ান্ট নেসলে, জার্মানির পাইকারি বিক্রেতা মেট্রো এজি এবং ফ্রান্সের খুচরা বিক্রেতা ওশানের সম্পদও একইভাবে সাময়িক ব্যবস্থাপনার অধীনে নিয়েছিল মস্কো। এরপর অক্টোবর মাসে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া এবং রাশিয়ান সম্পত্তি বেআইনিভাবে বাজেয়াপ্ত করার দোহাই দিয়ে আরও চারটি ইউরোপীয় কোম্পানির স্থানীয় সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেয় ক্রেমলিন।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের পর থেকেই টোকিও ও অন্যান্য পশ্চিমা মিত্ররা মস্কোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দুদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তবে সম্প্রতি সেই দূরত্ব আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। গত আগস্টে দুই দেশের সীমান্ত ও মালিকানা নিয়ে বিরোধপূর্ণ একটি দ্বীপে পুতিনের সফর এবং সাখালিন অঞ্চলে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে এক জাপানি সাংবাদিককে আটক করার পর থেকে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে থাকে। এর ওপর গত অক্টোবরে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে যে, একটি জাপানি কোম্পানির ইউক্রেনে ড্রোন বিক্রির সিদ্ধান্তকে তারা একটি ‘অবন্ধুসুলভ পদক্ষেপ’ বলে মনে করছে এবং এর জন্য কড়া জবাব দেওয়া হবে।

গত বছর পর্যন্ত রাশিয়ায় অবস্থানরত বেশির ভাগ জাপানি কোম্পানিই আশা করছিল যে পরিস্থিতি হয়তো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। এমনকি বাণিজ্য জোরদারকরণ সংস্থা জ্যাট্রো কর্তৃক ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আগামী এক থেকে দুই বছর অবস্থা পর্যালোচনা করে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, আর মাত্র ৬ শতাংশ কোম্পানি ব্যবসা গোটানো বা কমানোর কথা ভেবেছিল।

পরিস্থিতির আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় চলতি বছরের শুরুর দিকে জাপান সরকার মস্কোতে নিজস্ব কর্মকর্তা পাঠিয়ে স্থানীয় জাপানি ব্যবসা ও সম্পদ সুরক্ষায় যোগাযোগ রক্ষার চেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুতিনের এই নতুন কঠোর আদেশের মুখে সেই চেষ্টা বড় ধরনের ধাক্কা খেল।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights