স্বৈরাচার-গুপ্ত ফের এক হয়েছে
শফিউল আলম দোলন ও সিদ্দিক আল মামুন, ফেনী থেকে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, স্বৈরাচার এবং গুপ্ত আবার এক হয়েছে। তারা মিলেমিশে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে। যারা অরাজকতা তৈরি করে, তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, সচেতন হতে হবে।
গতকাল বিকালে ফেনী জেলার ফুলগাজী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মীদের সম্মানি প্রদান এবং অসহায় মানুষের সহায়তা কার্যক্রমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে একটি অরাজকতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। দেশের ভিতরে যারা পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে চায় তারা দেশের শত্রু। তিনি বলেন, ’৯১-এ তারা একসঙ্গে ছিল, ৮৭-তে একসঙ্গে ছিল। এমনকি গত ২৪ সালের নির্বাচনেও তলে তলে তারা একসঙ্গে কাজ করেছে। এদের সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
ফেনীপ্রধানমন্ত্রী গতকাল দিনভর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এতে বক্তব্য রাখেন, কৃষি ও মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপি, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. আবু ইফসুফ প্রমুখ। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে সড়কপথে রাজধানী ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন। দুপুর সোয়া ১টার দিকে তিনি ফেনীতে এসে পেঁৗঁছান। ফেনীতে নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে রাত ৮টার দিকে প্রধানমন্ত্রী পুনরায় সড়কপথে ঢাকায় ফেরেন। ফুলগাজীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, আমরা কথা রেখেছি। নির্বাচনের আগে আমরা বলেছিলাম কৃষক কার্ড দেব, ফ্যামিলি কার্ড দেব। ইমাম-পুরোহিতদের সম্মানি দেব। আমরা যদি এসব কাজ সফলভাবে করতে পারি, তাহলে জনগণ উপকৃত হবে। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন মানুষের উপকারের জন্য। বিএনপির রাজনীতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি। তিনি বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগের কথাও বলেন। দেশে অরাজকতা তৈরি হলে জনকল্যাণমূলক কাজ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনকল্যাণমুখী কাজগুলো সরকার ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে চায়। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ‘এক দফা’ কর্মসূচির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাদের কি খাল কাটা কর্মসূচি আছে? তাদের কি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি আছে? কৃষক কার্ড কর্মসূচি আছে? মানুষের জন্য তাদের রাজনীতি কই? একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে তারা ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রির কথা বলত। যার মালিক আল্লাহ, সেটি তারা কীভাবে দেবে। ওই দলের মুনাফেকি প্রকাশ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার পর গুপ্ত বাহিনী বলেছিল, তারা (স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ) যদি ফিরে আসে অসুবিধা নেই। বলবেই তো, তারা তো স্বৈরাচারের সঙ্গেই রাজনীতি করত। পরশুরামে ‘মহুরী-কহুয়া’ সেচ প্রকল্পের উদ্বোধনের পর এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। আমরা দেখেছি কীভাবে বিগত ১৬ বছর আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেই পরিস্থিতি পরিবর্তন করে আইনের শাসন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। তিনি বলেন, এই যে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বললাম, কৃষক কার্ডের কথা বললাম, খাল খননের কথা বললাম, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের কথা বললাম, বন্ধ মিল-কলকারখানা চালু করার কথা বললাম, এই কাজগুলো যদি বিঘ্ন ঘটে ক্ষতি কার হবে? এদেশের মানুষের না বিদেশি মানুষের। এদেশের মানুষের হবে। কিন্তু এই রাজনৈতিক দলগুলো দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। আমরা দেখেছি, ওই সময়ে তারা কীভাবে বিভিন্ন অন্যায় করেছিল, কীভাবে মা-বোনদেরকে হয়রানি করেছিল, মা-বোনদেরকে নির্যাতন করেছিল। প্রধানমন্ত্রী কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণকে বিভ্রান্ত করে তারা কিছু সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু তারা ধরাকে সরাজ্ঞান করছে এবং তারা যেভাবে একাত্তর সালে মা-বোনদের নির্যাতন করেছিল, ঠিক একইভাবে আবার তারা নারী নির্যাতন শুরু করেছে। আমরা দেখেছি, কীভাবে এই গুপ্ত বাহিনীর একজন সদস্য নারীর ওপর নির্যাতন করেছে এবং নির্যাতন করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে, তদন্তাধীন বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। কিন্তু মানুষ বলে শুধু নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয়নি, একটি মানুষের জীবনাবসান করে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে সময় এসেছে আমরা কাদের কথা বিশ্বাস করব, আর কাদের কথা বিশ্বাস করব না, আজকে সময় এসেছে কাদেরকে জনগণ সমর্থন দেবে, আর কাদেরকে সমর্থন দেবে না। আসুন যেকোনো মূল্যে আমরা গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখি।
উপজেলা হাসপাতাল দেড় শ শয্যার হবে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরশুরাম উপজেলায় ৫০ বেডের হাসপাতাল আছে। এই হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তখন ছিল ৩০ বেডের। পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি চলে যাওয়ার পরে আপনাদের সন্তান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই হাসপাতাল ৫০ বেডে উন্নীত করেছিলেন। এই এলাকার মানুষের দাবি হাসপাতালকে ১০০ বেডে রূপান্তরিত করা। ইনশা আল্লাহ এই হাসপাতালকে আমরা দেড় শ শয্যায় উন্নীত করব।
ফেনীতে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি এমনিতেই হবে। আর বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজকে জাতীয়করণের দাবি সম্পর্কে তারেক রহমান বলেন, এবার আপনারা ভালো রেজাল্ট করেন- পরের দিনই আমি জাতীয়করণ করে দেব।
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সভাপতিত্বে সমাবেশে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ণমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হেসেন আজাদ, সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
পরশুরামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প উদ্বোধন : ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল দুপুরে পরশুরাম উপজেলার উপকণ্ঠে এবং খোয়াইঘাট মুহুরী ব্রিজ এলাকায় প্রধানমন্ত্রী এ প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেন। পরে তিনি উপস্থিত স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী সেখানে বৃক্ষরোপণ করেন।
এ প্রকল্পের আওতায় ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণ এবং সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী ও ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন এবং সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু উপস্থিত ছিলেন।
খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ : প্রধানমন্ত্রী ফুলগাজীতে বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এরপর তিনি ফুলগাজী জেলা পরিষদ ডাকবাংলো পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্বোধন করেন।
ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সরকারি ভবনগুলোতে মোট ৯৬২.৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাগলনাইয়ায় ৪১৫ কিলোওয়াট, পরশুরামে ২৯৮ কিলোওয়াট এবং ফুলগাজীতে ২৪৯ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের গ্রামের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুরে। এবার সময়ের স্বল্পতার কারণে তিনি নানার বাড়িতে যেতে পারেননি। ফুলগাজীসহ তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত ফেনী-১ আসনের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের স্মৃতি জড়িত।
১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
ফুলগাজীর অনুষ্ঠানে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৫১০টি ফ্যামিলি কার্ড এবং ফেনী জেলার ৭ হাজার ৬৪৩ জনকে কৃষক কার্ড দেওয়ার কর্মসূচি ছিল। এ ছাড়া ফুলগাজীতে ২৩৮ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতকে সম্মানি দেওয়ার কথা ছিল।
