কঙ্গোতে ইবোলা আক্রান্ত ১০ হাজার ছাড়াল, মৃত্যু প্রায় ৫ হাজার

অনলাইন ডেস্ক

আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটিতে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের। দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, চিকিৎসাসেবার ঘাটতি এবং আক্রান্তদের শনাক্ত ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে নানা বাধার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

২৭ অক্টোবর প্রকাশিত আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬০ জনে। মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৮৮৭ জনের। দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ২৯ অক্টোবরের হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত কঙ্গোতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ১০ হাজার ১৯৩ এবং মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ৯৬০ হয়েছে।

গত ১৫ মে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়। বিরল প্রজাতির বান্দিবুগিও ভাইরাসের কারণে এ সংক্রমণ ছড়িয়েছে। ইবোলার এই প্রজাতির বিরুদ্ধে অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা এখনো নেই। তবে ২৩ অক্টোবর কঙ্গোতে এ ভাইরাসের টিকা নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

আটটি প্রদেশে সংক্রমণ

কঙ্গোর আটটি প্রদেশের ৬৬টি স্বাস্থ্য এলাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। প্রত্যন্ত ও নতুন আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চিকিৎসাসামগ্রী, যানবাহন এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে। কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাঁদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া। অনেক পরিবার অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে পাঠাতে কিংবা মৃত ব্যক্তির মরদেহ নিরাপদে দাফনের জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতে তুলে দিতে অনিচ্ছুক। ভুল তথ্য, ভয় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশই এমন মানুষ, যাঁদের সংক্রমণের যোগসূত্র স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে থাকা সংক্রমণশৃঙ্খলের বাইরে। আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের মতে, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে বিবেচনা করতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ নতুন আক্রান্তকে আগে শনাক্ত হওয়া রোগীদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে শনাক্ত করতে হবে।

আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের অনেকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই মারা যাচ্ছেন। এতে রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব এবং চিকিৎসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

চিকিৎসাসেবা ব্যাহত, হামলার শিকার স্বাস্থ্যকর্মীরা

ইবোলার প্রাদুর্ভাবের কারণে কঙ্গোর অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। কোনো কোনো প্রদেশে মাতৃমৃত্যু বেড়েছে; সংক্রমণের আশঙ্কায় গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে যেতে অনীহাও এর একটি কারণ।

স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রোগীর চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ২৪ অক্টোবর পূর্ব কঙ্গোর বাফওয়াসেন্দে এলাকায় ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে এক রোগীর বিষয়ে সাড়া দিতে গিয়ে হামলায় এক নার্স নিহত হন এবং আরেক স্বাস্থ্যকর্মী গুরুতর আহত হন বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বকেয়া পারিশ্রমিক ও ভাতার প্রতিবাদে কোনো কোনো এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ বন্ধও রেখেছেন। এসব কারণে সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সীমান্ত পেরিয়ে ছড়ানোর উদ্বেগ

কঙ্গোর বাইরে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ায় আঞ্চলিক উদ্বেগও বাড়ছে। কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় এ প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। উগান্ডা ও ফ্রান্সেও এ প্রাদুর্ভাবের সময় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছিলেন। তবে এসব দেশের পরিস্থিতি এক নয়; কোথাও বর্তমানে সক্রিয় সংক্রমণ নেই, আবার কোথাও রোগীদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ২৯ অক্টোবরের তথ্যমতে, কেনিয়ায় ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত নয়জন আক্রান্ত এবং দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নাইজেরিয়ায় শনাক্ত হওয়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য সুইজারল্যান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের কাজ চলছে।

২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার যে মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল, সেটি এখনো বিশ্বে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব। তবে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের দ্রুত বিস্তার এবং সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণের কারণে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হতে পারে।

তথ্য সূত্র- আলজাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights