গুগলের পর অ্যাপল ম্যাপসেও ‘লেক অন্টারিও’র নাম বদলে হলো ‘লেক আমেরিকা’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চলমান উত্তপ্ত বাণিজ্য সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি গিয়ে পড়েছে ডিজিটাল মানচিত্রে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত এক নির্বাহী আদেশের পর বিখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যাপল তাদের ‘অ্যাপল ম্যাপস’ অ্যাপে ঐতিহাসিক ‘লেক অন্টারিও’ নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ হিসেবে প্রদর্শন শুরু করেছে। তবে এই পরিবর্তনটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অ্যাপল ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হচ্ছে। কানাডায় অবস্থানকারী ব্যবহারকারীরা এখনো এই জলাশয়ের নাম ‘লেক অন্টারিও’-ই দেখতে পাচ্ছেন।
চাঞ্চল্যকর এই পরিবর্তনের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও অ্যাপল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
গত মাসের শেষের দিকে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। বাণিজ্যচুক্তি ব্যর্থ হওয়ার জেরে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই ২০০ কোটি ডলার বা ২৭০ কোটি কানাডিয়ান ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। অ্যাপলের এই সিদ্ধান্তের আগেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গুগলও গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ব্যবহারকারীদের জন্য লেকের নামটি পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন এই শুল্ক হানার জবাবে কানাডাও বেশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশটির সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ‘ডলারের বদলে ডলার’ নীতিতে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে। মার্কিন বাণিজ্য দলের অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য দাবির মুখে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রশাসন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা টেবিল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আলোচনা পুনরারম্ভের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেছেন, নতুন করে কোনো আলোচনা শুরুর আগে মার্কিন প্রশাসনকে অবশ্যই ‘অনর্থক কঠোর ভাব দেখানো বন্ধ করতে হবে এবং আন্তরিক ও গম্ভীর মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জারি করা নির্বাহী আদেশের অধীনে মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থাননামসংক্রান্ত অফিশিয়াল ডাটাবেজ ‘জিওগ্রাফিক নেমস ইনফরমেশন সার্ভিস’-এ পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নামটি হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডাগ বারগাম নিশ্চিত করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশেষভাবে অ্যাপলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তারা নির্বাহী আদেশের পূর্ণ অনুসরণে তাদের অ্যাপল ম্যাপসে লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন নিশ্চিত করে। এই বিতর্কিত পদক্ষেপের পক্ষে প্রচার চালাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করেছেন। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি নিজে ‘লেক অন্টারিও’ সাইনবোর্ড লাথি মেরে ফেলে দিয়ে সেখানে ‘ওয়েলকাম টু লেক আমেরিকা’ লেখা নতুন সাইনবোর্ড বসাচ্ছেন।
মার্কিন এই বাণিজ্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপের মুখে লেক-সংলগ্ন কানাডীয় সীমান্তে স্পষ্ট বার্তা ঝুলিয়ে দিয়েছে অটোয়া। তারা লেকের তীরে একটি নতুন বিশালাকার সাইনবোর্ড স্থাপন করেছে যেখানে লেখা রয়েছে, ‘লেক অন্টারিও: এখন এবং চিরকাল’। লেকের তীরে দাঁড়িয়ে অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা অন্য কেউ যেন ভুলে না যান, সেজন্যই আমরা এই সাইনবোর্ডটি বসিয়েছি। তাদের স্মরণে রাখা উচিত, এটি লেক অন্টারিও ছিল, আছে এবং চিরকাল লেক অন্টারিও-ই থাকবে।’
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে উত্তর আমেরিকার পাঁচটি ‘গ্রেট লেকস’-এর মধ্যে ক্ষুদ্রতম এই ‘লেক অন্টারিও’ কানাডার অন্টারিও প্রদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সীমানার মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পাঁচটি লেকের চারটির নামই—অন্টারিও, হিউরন, মিশিগান এবং ইরি—এসেছে আমেরিকার আদিবাসী আমেরিকান শব্দ থেকে। শুধু লেক সুপিরিয়রের নামটি এসেছে ফরাসি ভাষার ইংরেজি রূপান্তর থেকে। ঐতিহাসিক এই নাম বদলের ট্রেন্ড অবশ্য সব মানচিত্র প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান মেনে নেয়নি। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিনামূল্যে মানচিত্র সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাপকোয়েস্ট’ শুক্রবার তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পোস্টে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘আমরা এই নাম পরিবর্তন করছি না।’ প্রতিষ্ঠানটির এই কঠোর অবস্থানের পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে কানাডার অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে সর্বাধিক ডাউনলোড হওয়া ফ্রি অ্যাপের তালিকায় শীর্ষস্থানে উঠে আসে ম্যাপকোয়েস্ট।
প্রযুক্তি খাতে মার্কিন সরকারের এমন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নতুন নয়। গুগল গত সপ্তাহে এক ব্লগ পোস্টে স্বীকার করে যে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবহারকারীদের জন্য তাদের ম্যাপ সেবায় নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘সরকারি অফিশিয়াল উৎসের নাম পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করতে’ এই আপডেট দেওয়া হয়েছে। যার ফলে আমেরিকান ব্যবহারকারীরা ‘লেক আমেরিকা’ দেখতে পেলেও কানাডার ব্যবহারকারীরা ‘লেক অন্টারিও’ দেখছেন।
এর আগেও ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ঘোষণা করেছিলেন যে ‘মেক্সিকো উপসাগর’কে এখন থেকে ‘আমেরিকা উপসাগর’ নামে ডাকা হবে, তখনো গুগল তাদের মার্কিন ব্যবহারকারীদের জন্য স্থানটির নাম পরিবর্তন করেছিল। মেক্সিকোর পক্ষ থেকে ওই সময় বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও মার্কিন ব্যবহারকারীদের জন্য উপসাগরের নাম বদলে ফেলায় টেক জায়ান্ট গুগলের বিরুদ্ধে মেক্সিকো সরকার একটি মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে অ্যাপলও তাদের ম্যাপস অ্যাপে মার্কিন ব্যবহারকারীদের জন্য মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ করেছিল।
সূত্র: বিবিসি
