ভারত মহাসাগরের নির্জন দ্বীপে ১ লাখ ৮০ হাজার কচ্ছপের সন্ধান

অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘ কয়েক দশকের ধারাবাহিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার পর ভারত মহাসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা দ্বীপরাষ্ট্র সিশেলসে অভূতপূর্ব পরিবেশগত সাফল্য উন্মোচিত হয়েছে। দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চল আলদাব্রা অ্যাটোল দ্বীপে চালানো সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বিলুপ্তির মুখ থেকে ফিরে আসা বিরল প্রজাতির ‘আলদাব্রা জায়ান্ট টরটয়েজ’-এর সংখ্যা এখন ১ লাখ ৮০ হাজারে গিয়ে পৌঁছেছে।

দক্ষিণ পশ্চিম নিউজ সার্ভিস সূত্রে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো এই কচ্ছপের সংখ্যা সিশেলসের মোট মানব জনসংখ্যাকেও বহু গুণে ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব সংরক্ষণের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করল।

বিশ্বের বৃহত্তম এই উন্মুক্ত কচ্ছপ সংখ্যার ওপর জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে সিশেলস আইল্যান্ডস ফাউন্ডেশন (এসআইএফ) এবং যুক্তরাজ্যের এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সংগৃহীত কচ্ছপ গণনার নিখুঁত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষক দলটি এই চূড়ান্ত ফলাফলে পৌঁছেছেন। এর আগে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত তথ্যে এই দ্বীপে কচ্ছপের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ। দীর্ঘ সময় পর প্রকাশিত এই নতুন আপডেট নিশ্চিত করেছে যে, প্রজাতিটি কেবল টিকে নেই, বরং নতুন উদ্যমে সংখ্যায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুরো বিশ্বে বন্য পরিবেশে বিশালাকৃতির কচ্ছপের বিচরণ দেখা যায় কেবল দুটি স্থানে, যার মধ্যে অন্যটি হলো প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। সেচেলেসের এই আলদাব্রা অ্যাটোলে থাকা কচ্ছপের বিশাল বহরটিই এখন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুক্ত দল।

আন্তর্জাতিক পরিবেশবিষয়ক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, উল্লেখিত পাঁচ বছরের পর্যবেক্ষণ মেয়াদে কচ্ছপের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশ স্থিতিশীল ছিল। গবেষকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী বর্তমানে এই দ্বীপে পূর্ণবয়স্ক ও প্রায়-পূর্ণবয়স্ক কচ্ছপের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার। সিশেলস আইল্যান্ডস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফ্রাউকে ফ্লেশার-ডগলি আনন্দের সঙ্গে জানান, তাদের অ্যাটোল বা প্রবালদ্বীপে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বিশাল কচ্ছপ স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে; এই তথ্য প্রমাণ করে যে পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার কী ধরনের বিস্ময়কর সাফল্য এনে দিতে পারে। এটি সিশেলস, সমগ্র বিশ্ব এবং যারা আলদাব্রাকে রক্ষা করতে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন, তাদের প্রত্যেকের জন্য এক দারুণ আনন্দের সংবাদ।

অথচ উনবিংশ শতাব্দীতে পরিস্থিতি এমন ছিল না। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত শিকার ও নির্মম শোষণের কারণে দ্বীপে আলদাব্রা কচ্ছপের সংখ্যা এক হাজারেরও নিচে নেমে এসেছিল। চরম সংকটের মুখে শুরু হওয়া দীর্ঘ পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ফলে ১৯৮১ সালে আলদাব্রাকে কঠোর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ১৯৮২ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। গবেষকরা বলছেন, এটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম সেরা সংরক্ষণ সাফল্যের গল্প, যা নতুন এই গবেষণায় আবার প্রমাণিত হলো।

গবেষণার সহ-লেখক ড. ন্যান্সি বানবুরি জানান, অঞ্চলের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী তদারকি কর্মসূচি সত্ত্বেও অ্যাটোলের ঘন উদ্ভিদের কারণে কচ্ছপ গণনা করা বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে আমরা যেসব প্রাণী সরাসরি দেখতে পেয়েছি এবং যেগুলো ঘন ঝোপঝাড়ের কারণে আড়ালে ছিল; সবকিছু বৈজ্ঞানিক মডেলিংয়ের আওতায় এনে এই অনন্য প্রজাতিটির জন্য এ যাবৎকালের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক তৈরি করেছি। এটি আগামী দশকগুলোতে এদের জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

এই অভাবনীয় সাফল্যের পরও গবেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, শিথিলতার কোনো সুযোগ নেই এবং সদা জাগ্রত পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বজুড়ে বদলে যাওয়া জলবায়ুর কারণে আলদাব্রাতেও দীর্ঘ ও বারবার খরা হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, যা কচ্ছপদের প্রয়োজনীয় ছায়া ও খাবারের অভাব ঘটাবে। পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বীপের নিচু অংশগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর পাশাপাশি বুনো বিড়াল ও কালো ইঁদুরের মতো আক্রমণাত্মক স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি এখনো বড় হুমকি, কারণ এরা কচ্ছপের ডিম ও সদ্য ফোটা ছানাদের শিকার করে।

গবেষকদের মতে, এই ক্ষতিকর বহিরাগত প্রাণীদের সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা গেলে তা কচ্ছপের বংশবৃদ্ধির শেষ বাধাটি সরিয়ে দেবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মোকাবিলায় এদের আরও সহনশীল করে তুলবে। এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্নওয়াল ক্যাম্পাসের পোস্টডক্টরাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ড. ডেভ হাডসন মন্তব্য করেছেন, এই ফলাফল পরিবেশকর্মীদের নিরলস চেষ্টার প্রতিফলন এবং কচ্ছপগুলোর জন্য বিরাট সুসংবাদ। তবে মনে রাখতে হবে এটি একটি যাত্রার সূচনা মাত্র, কোনো শেষ বিন্দু নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও বহিরাগত প্রজাতির মতো বাড়তে থাকা হুমকির মুখে আগাম পদক্ষেপ নিতে এই গবেষণালব্ধ তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপকদের সঠিক পথ দেখাবে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights