২০ মিনিটে ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টো চুরি, যেভাবে ঘটল ইতিহাসের বৃহত্তম হ্যাকিং

অনলাইন ডেস্ক

মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধান। এর মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। ঘটনাটিকে ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ হামলায় কীভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙা হলো, কারা জড়িত এবং লুট হওয়া অর্থের শেষ পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

কীভাবে ঘটল এত বড় চুরি?
বাইন্যান্সের তথ্য এবং ব্লকচেইনে সংরক্ষিত লেনদেনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, লেনদেন পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত প্রতিষ্ঠানটির একাধিক ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি সরিয়ে নেয় হামলাকারীরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানায়, শুরুতে তাদের ধারণা ছিল, একটি ল্যাপটপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। তবে পরবর্তী তদন্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা ভাঙার আরও কয়েকটি সম্ভাব্য পথ ও দুর্বলতা শনাক্ত হয়েছে। যদিও সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

বাইন্যান্সের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ একটি তহবিল রয়েছে। এক বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন দিয়ে গঠিত এই রিজার্ভের উদ্দেশ্য গ্রাহকদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া।

প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, চুরি হওয়া সম্পদের ক্ষতি ওই তহবিল এবং কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ থেকে পূরণ করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের তথ্যমতে, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের লেনদেন অনুমোদনের কাজে ব্যবহৃত ‘সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিল। এর ফলে আক্রান্ত ওয়ালেটগুলো থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ পায় তারা।

ব্লকচেইনের লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৮টার পরপরই অর্থ সরানোর কার্যক্রম শুরু হয়। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে লুটের বড় অংশ সম্পন্ন করে হ্যাকাররা।

চুরির পরপরই অর্থ বিভিন্ন ডিজিটাল ঠিকানায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যাতে বাইন্যান্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং স্টেবলকয়েন ইস্যুকারীরা সেগুলো জব্দ করতে না পারে। তবে ইতোমধ্যে চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক জব্দ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বাইন্যান্স।

টেথারের ইউএসডিটি ও সার্কেলের ইউএসডিসির মতো বড় স্টেবলকয়েনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এসব মুদ্রার ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান দূর থেকেই নির্দিষ্ট ডিজিটাল সম্পদ জব্দ করতে পারে।

হংকংয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিসংশ্লিষ্ট মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী জশুয়া চু বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, সহজভাবে বললে, হ্যাকাররা হয়তো অর্থ রাখার ভল্টের চাবি চুরি করেনি; বরং ভল্ট থেকে অর্থ বের করার নির্দেশ দেওয়ার ব্যবস্থাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

কারা জড়িত এই সাইবার হামলায়?
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের ধারণা, বাইন্যান্সে চালানো হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের আগের কয়েকটি সাইবার অভিযানের মিল রয়েছে। তবে বাইন্যান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

উত্তর কোরিয়া বরাবরই সাইবার হামলা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেনেভায় দেশটির মিশন এবং চীনে অবস্থিত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, বাইন্যান্সে চালানো হামলার সঙ্গে গত বছর ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে সংঘটিত সাইবার হামলার বেশ কিছু মিল রয়েছে। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। বাইন্যান্সে হামলার পেছনেও একই গোষ্ঠী রয়েছে বলে নিজেদের ধারণার বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে টিআরএম ল্যাবস।

অন্যদিকে, ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিস জানিয়েছে, গত মাসে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটজেটে চালানো হামলায় চুরি হওয়া অর্থের সঙ্গে বাইন্যান্স থেকে লুট করা সম্পদ মেশানো হচ্ছে।

চুরি হওয়া অর্থ কোথায় গেল?
বাইন্যান্স থেকে লুট হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেকই ছিল স্টেবলকয়েন। টেথার, সার্কেল, রিপল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের ক্রিপ্টো উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা এসব ডিজিটাল মুদ্রা ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।

তবে সম্পদ জব্দ করা হলেই সেগুলো সরাসরি বাইন্যান্সের কাছে ফেরত যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে এই পদক্ষেপের ফলে হ্যাকারদের জন্য এসব মুদ্রা নগদ অর্থে রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়েছে। টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন ও ইথার এখনো জব্দের আওতার বাইরে রয়েছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক ব্লকচেইন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান চেইনআর্গোসের প্রধান আইন কর্মকর্তা প্যাট্রিক ট্যান জানিয়েছেন, বিটকয়েন ও ইথার কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ইস্যু করে না। ফলে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসব ডিজিটাল সম্পদ জব্দ করা সম্ভব নয়।

তার মতে, হ্যাকাররা এসব বিটকয়েন ও ইথার এমন কোনো ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বা ব্রোকারের কাছে পাঠালে সেগুলো আটকে দেওয়া সম্ভব হতে পারে, যারা সম্পদ জব্দ করার সক্ষমতা রাখে এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত ডিজিটাল চাবি বা ‘প্রাইভেট কি’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেও সম্পদ আটকে দেওয়া সম্ভব।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশ্লেষকদের ধারণা, চুরি করা অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করতে হ্যাকাররা সেগুলো অন্য ডিজিটাল সম্পদের সঙ্গে মেশানোর চেষ্টা করতে পারে। এ ছাড়া অর্থ স্থানান্তরের জন্য কম পরিচিত ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

স্টেবলকয়েন অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান ট্রেস ফাইন্যান্সের প্রধান নির্বাহী বার্নার্ডো ব্রিটেস বলেন, সাধারণত এ ধরনের সাইবার হামলার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চুরি হওয়া অর্থ সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে হ্যাকাররা।

তিনি আরও বলেন, সময় যত বাড়ে, অন্য এক্সচেঞ্জ বা পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তত কমে যায়। কারণ, একপর্যায়ে এসব সম্পদ কালো তালিকাভুক্ত হয়ে পড়ে।

চেইনঅ্যানালাইসিস তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক পোস্টে জানিয়েছে, তদন্তকারীরা অর্থ পাচারের এমন কিছু কৌশল পর্যবেক্ষণ করছেন, যেগুলো আগে দেখা যায়নি। অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার লেনদেনের মাধ্যমে অর্থের গতিপথ আড়াল করতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করছে হামলাকারীরা।

প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হ্যাকাররা শুধু একটি ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায় অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে না; একই অর্থ বারবার বিভিন্ন ডিজিটাল ঠিকানায় স্থানান্তর করছে। এমনকি লেনদেনের ধারাবাহিকতায় আগে ব্যবহৃত ঠিকানাগুলোতেও পুনরায় অর্থ পাঠানো হচ্ছে।

ক্রিপ্টো বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে ধারাবাহিকভাবে বড় ধরনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে বাইন্যান্সে এই হামলা ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক ঘটনায় মোট ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।

বাইন্যান্সে সর্বশেষ এই ঘটনা ডিজিটাল সম্পদ খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থায়ও প্রভাব ফেলেছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারদর কমেছে। একই সঙ্গে স্টেবলকয়েনের সম্মিলিত বাজারমূল্যও হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা থেকে ডিজিটাল সম্পদ খাত থেকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights