আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে মণি মাঝির প্রদর্শনী
সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
সুন্দরবনের নদী, বন, জীববৈচিত্র্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের শিল্পিত অনুসন্ধান নিয়ে ঢাকায় শুরু হয়েছে শিল্পী মণি মাঝির একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘নন-ডুয়ালিটি (অদ্বৈত)’। মানুষ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং পরিবেশগত সংকটের নানা দিক উঠে এসেছে এই প্রদর্শনীতে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়।
আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনীটি। সুন্দরবনের পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে ‘নন-ডুয়ালিটি’। এতে নদী, বন, জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ত পানি, মাটি, প্রাণী, পৌরাণিক আখ্যান ও লোকবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সংযুক্তির জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন শিল্পী। ‘অদ্বৈত’ ধারণার আলোকে এখানে ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের বিভাজন অতিক্রম করে মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণের অভিন্ন অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে।
সুন্দরবন অঞ্চলের লোকজ বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেও রয়েছে এই অদ্বৈত ভাবনার প্রতিফলন। সেখানে বনদুর্গা ও বনবিবিকে একই মায়ের রূপ হিসেবে দেখা হয়। একইভাবে পবন ঠাকুর ও পবন পির স্থান করে নিয়েছেন অভিন্ন লোকবিশ্বাসের সাংস্কৃতিক পরিসরে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আতিথেয়তা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এসব ঐতিহ্য মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্কের পরিচয় বহন করে।
প্রদর্শনীতে দৈনন্দিন জীবনের নানা লোকাচারও বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। অতিথিকে সম্মান জানিয়ে বসতে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত নিচু কাঠের পিঁড়ি যেমন আতিথেয়তার প্রতীক, তেমনি ঝড়-বৃষ্টির সময় প্রকৃতির শক্তি প্রশমনের কামনায় পবনকে শিন্নি ও পায়েস নিবেদনের রীতিতে প্রকাশ পেয়েছে প্রকৃতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও নির্ভরশীলতা। তবে সুন্দরবনের এই পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য আজ নানা কারণে হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চাপ এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ে বদলে যাচ্ছে নদী ও ভূপ্রকৃতি। বাড়ছে মাটির লবণাক্ততা, সংকুচিত হচ্ছে প্রাণীদের আবাসস্থল। একই সঙ্গে সংকটের মুখে পড়ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। এমন বাস্তবতায় প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে ‘সবুজের শরণার্থী’ হয়ে ওঠার এক তাৎপর্যপূর্ণ ধারণা। এই বাস্তুচ্যুতি শুধু মানুষের নয়; নদী, বীজ, বৃক্ষ ও প্রাণীও হারাচ্ছে তাদের চিরচেনা আবাসস্থল। ফলে পরিবেশের সংকট কেবল প্রকৃতির সংকট নয়, বরং সমগ্র জীবজগতের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে মণি মাঝি মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সম্পর্কগুলোকে নতুন করে উপলব্ধি করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্বকারী সত্তা নয়, বরং বৃহত্তর জীবজগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মানুষকে দেখার জীবনবোধই এ শিল্পকর্মগুলোর অন্যতম মূল বক্তব্য।
প্রদর্শনীটি প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
