ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, জয়ের স্বপ্ন ডেমোক্র্যাটদের
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে শুরু হয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কাজের মূল্যায়ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে এই নির্বাচনকে। ভোটের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকায় কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর শঙ্কায় রয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। আজ রাতের মধ্যে ভোটের ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মাত্র দুটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। বাকি প্রায় সব নির্বাচনেই আসন হারিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। এবারও সেই ধারাবাহিকতার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তের সুযোগও তৈরি হবে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও চাপে পড়বেন ট্রাম্প।
এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হচ্ছে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আইনসভাগুলোর হাজার হাজার আসনেও ভোট হচ্ছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোটারদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ধনকুবেরদের ওপর কর আরোপ এবং গর্ভপাতের অধিকারসংক্রান্ত বিষয়।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত তিনটি আসন বাড়াতে হবে। আর সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তাদের নিট চারটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন।
জরিপে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া গেছে। দেশজুড়ে পরিচালিত একটি জরিপে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ শতাংশ ভোটার। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের সমর্থন জানিয়েছেন ৩৮ শতাংশ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপেও ডেমোক্র্যাটদের ১১ পয়েন্টে এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। ওই জরিপে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা।
ট্রাম্প এবারের নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও ভোটের লড়াইয়ে তাঁকেই কেন্দ্র করে চলছে রাজনৈতিক প্রচার। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে।
সিএনএনের ‘পোল অব পোলস’ অনুযায়ী, ট্রাম্পের গড় জনসমর্থন এখন ৩৪ শতাংশ। অক্টোবরে সিএনএনের একটি জনমত জরিপে তাঁর প্রতি সমর্থন নেমে আসে ৩২ শতাংশে। একই জরিপে ৭৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ জানান। অন্য একটি জরিপেও তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৩২ শতাংশ উত্তরদাতা। এর আগে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তাঁর সমর্থন ৩১ শতাংশে নেমেছিল।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার পেছনে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, শুল্কনীতি এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়া লাতিনো ভোটারদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে ব্যাপক ধরপাকড় ও বহিষ্কার অভিযান তাঁদের একটি অংশকে ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের প্রচারে নিজের সাফল্যের দাবি
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিনও নিজের প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন ট্রাম্প। অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান রাখতে হবে। এখন আমরা মহান। দুই বছর আগে আমাদের অবস্থা ছিল ভয়াবহ।’
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প দাবি করেন, আগে বিশ্বের অন্য দেশের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিতেন না। এখন সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে সম্মান করে। তাঁর ভাষ্য, এই অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি আরও ভালো করবে তাঁর প্রশাসন।
তবে ট্রাম্পের সমালোচকেরা বলছেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। দ্রব্যমূল্য কমানোর বদলে বেড়েছে জ্বালানি ও খাদ্যের খরচ। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির কারণে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের ও পরিবারের সম্পদ বাড়ানোর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা সহায়তা বন্ধের ঘোষণা
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরুর দিনেই ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প জানান, এ সহায়তা বন্ধে ইসরায়েলের আপত্তি নেই। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০১৯ সালে কার্যকর হওয়া এই সহায়তা চুক্তি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির আওতায় ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলকে বছরে ৩৮০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েল আমাদের এক নম্বর মিত্র। অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমরা তাদের বেশি সহায়তা দিই। এখন তাদের আর সেই সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে তাদের প্রয়োজন হলে আমি সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষেই বলতাম। ইসরায়েলের প্রয়োজন হলে আমরা তাদের সহায়তা করব।’
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক খাতে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর এই হিসাব করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো দেশকে এত বেশি সহায়তা দেয়নি।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে চাপে পড়বেন ট্রাম্প
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে বড় বাধা তৈরি হবে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তে সমন জারির ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্প প্রশাসনের দুর্নীতি, ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং তাঁর পরিবারের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তদন্তের বিষয় হতে পারে।
অন্যদিকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল তাই শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করবে না, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক গতিপথও ঠিক করে দিতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, দুই দলেই নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন
