৩৩ কর্মকর্তা বহিষ্কার: এটাই কী শির ‘অসুস্থ গাছ’ উপড়ে ফেলা?

অনলাইন ডেস্ক

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে ‘অন্তহীন যাত্রা’ বলেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চলতি বছরের শুরুর দিকে দেওয়া তার সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন রেকর্ডসংখ্যক ৩৩ কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির সামরিক বাহিনীর সাবেক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়াও।

শীর্ষ পর্যায়ের এত কর্মকর্তার অপসারণের পর প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি কেবল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, নাকি এর মধ্য দিয়ে দলের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছেন জিনপিং?

গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে চার দিনের পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন (পঞ্চম প্লেনাম) শেষ হয়। এতে কমিউনিস্ট পার্টির ৩৩ সদস্যকে বহিষ্কারের আগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির এই অধিবেশনে দলের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

এবারের অধিবেশনে ২০২২ সালে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটির ৩৭৬ জন পূর্ণ ও বিকল্প সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৭৯ জন। অর্থাৎ মূল সদস্যদের এক-চতুর্থাংশের বেশি অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের অনেকেই শুদ্ধি অভিযানের আওতায় পদ হারিয়েছেন। আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে এত বেশি আসন ফাঁকা থাকার নজির নেই।

বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের মধ্যে চীনের সামরিক বাহিনীর সাবেক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া ও জিনজিয়াং অঞ্চলের সাবেক কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান মা শিংরুইও আছেন। তবে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্য অনুপস্থিত সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত কারণ জানানো হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক নিল থমাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, আরও বেশি আসন ফাঁকা থাকা শির কঠোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের প্রতিফলন।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আরও বিস্তৃত?
এবারের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থার ওপর। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পার্টির দুর্নীতি দূর করতে অভিযান শুরু করেন শি জিনপিং। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অভিযান আরও জোরদার করেন। এর আওতায় দল, সরকার ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বাদ পড়েছেন।

সামরিক নেতৃত্বেও পরিবর্তন
ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযানের প্রভাব পড়েছে চীনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনেও (সিএমসি)। সাত সদস্যের এই কমিশন চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে।

একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে অপসারণের পর কমিশনটিতে এখন সদস্য রয়েছেন মাত্র দুজন। তারা হলেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও সামরিক বাহিনীর দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা ঝাং শেংমিন। ফলে কমিশনের নেতৃত্বের কাঠামো ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এছাড়া অধিবেশনে ঝাং শেংমিনকে দলের প্রধান নীতি-নির্ধারণী ও কার্যনির্বাহী কমিটি পলিটব্যুরোর সদস্য করা হয়েছে। এই ঝাং এখন সংস্থাটির একমাত্র সামরিক সদস্য।

এদিকে, আগামী কংগ্রেসে শি জিনপিং চতুর্থবারের মতো দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেটি হলে তিনি মাও সে-তুংয়ের পর কমিউনিস্ট চীনের সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা নেতা হবেন।

শুধুই দুর্নীতি দমন?
শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চলমান এই অভিযানের ঘোষিত উদ্দেশ্য দুর্নীতি দমন ও দলের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়া কিংবা নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে।

এবারের ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান আগামী কংগ্রেসে নেতৃত্ব নির্বাচনকে জটিল করে তুলতে পারে বলেও ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার মতো অভিজ্ঞ ও যোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা কমে আসতে পারে। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। দলের অভ্যন্তরে দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ে শি জিনপিং বিভিন্ন সময়ে কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে তিনি বলেন, দলকে অবশ্যই ‘অসুস্থ গাছ’ উপড়ে ফেলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে তিনি ‘অন্তহীন যাত্রা’ বলেও উল্লেখ করেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights